বেসরকারি সম্পদ বিনিয়োগে বীমা খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা মোনেটারি অথরিটি অব সিঙ্গাপুর (এমএএস) বীমা খাতে বেসরকারি সম্পদে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এ খাতে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষত তারল্য সংকট, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং চাপের সময়ে দায় পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

গত ৩০ মার্চ লাইফ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক মধ্যাহ্নভোজে এমএএস-এর সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কাস লিম এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি জানান, বীমা কোম্পানিগুলো এখন ক্রমশই প্রাইভেট ইকুইটি ও প্রাইভেট ক্রেডিটের মতো বিকল্প বিনিয়োগমুখী সম্পদে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে অ্যাসেট-ইনটেনসিভ রিইনস্যুরেন্স (এআইআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এসব সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এআইআর মূলত এমন একটি আর্থিক কাঠামো, যার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের দায় ও ঝুঁকির একটি অংশ পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যালান্স শিটকে আরও নমনীয় ও কার্যকর করতে পারে এবং জটিল বিনিয়োগ বাজারে বিশেষজ্ঞ দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। তবে এই কাঠামো ব্যবহার করতে গিয়ে কিছু মৌলিক ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে, যা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইআর ব্যবস্থায় অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো জামানতের গুণগত মান। যদি জামানত হিসেবে ব্যবহৃত সম্পদের মান নিম্নমানের হয়, তবে সংকটের সময় তা পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হতে পারে। পাশাপাশি, বেসরকারি সম্পদ সাধারণত কম তারল্যসম্পন্ন হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাজার অস্থিরতার সময় এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করাও জটিল হয়ে ওঠে।

নিম্নে বেসরকারি সম্পদে বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রধান ঝুঁকিগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারণি উপস্থাপন করা হলো:

ঝুঁকির ধরনবিশদ ব্যাখ্যা
তারল্য ঝুঁকিপ্রয়োজনের সময় দ্রুত সম্পদ বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি
মূল্যায়ন ঝুঁকিঅপ্রকাশ্য বাজারের কারণে সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা
জামানত ঝুঁকিবিনিয়োগ সুরক্ষায় ব্যবহৃত সম্পদের মান নিম্ন হলে ক্ষতির সম্ভাবনা বৃদ্ধি
পুনরুদ্ধার দায় ঝুঁকিসংকটকালীন সময়ে পুনরায় দায় গ্রহণে আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি
বাজার অস্থিরতাবৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনে বিনিয়োগের মূল্য হ্রাস পাওয়া

মার্কাস লিম জোর দিয়ে বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর উচিত শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত স্ট্রেস টেস্টিং, সম্ভাব্য ঝুঁকির পূর্বাভাস এবং পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ। তিনি সতর্ক করে দেন, উচ্চ মুনাফার লোভে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গ্রাহকের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।

এমএএস জানিয়েছে, তারা চলতি বছরের মধ্যেই এ খাতে আরও সুস্পষ্ট ও কড়াকড়ি নির্দেশিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অপারেশনাল ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে, যার ওপর মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়া আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

লিম আরও উল্লেখ করেন, গত বছরের কয়েকটি ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে বাহ্যিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা ভেন্ডররা বীমা খাতে একটি দুর্বল সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সাইবার আক্রমণ বা সেবার ব্যাঘাত গ্রাহকের আস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং পুরো শিল্পের সুনামকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

সার্বিকভাবে, এমএএস মনে করে যে বীমা খাতে বেসরকারি সম্পদে বিনিয়োগ সম্পূর্ণরূপে নিরুৎসাহিত করার বিষয় নয়, বরং তা সুশাসিত, স্বচ্ছ এবং ঝুঁকিনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করা জরুরি। যথাযথ নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং দায়িত্বশীল বিনিয়োগ কৌশল নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবে।