দেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল যোগাযোগকে আরও নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘পার্টনার নেটওয়ার্ক’ বিষয়ক একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। রোববার প্রকাশিত এই নীতিমালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সেই লক্ষ্যেই এই বিস্তৃত নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে তফসিলি ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী এবং বিভিন্ন পেমেন্ট সেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে, যার মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়।
নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় একটি এক্সট্রানেটভিত্তিক পার্টনার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত পরিবেশে এই নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নীতিমালার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত দল বা ইউনিট গঠন করতে হবে, যারা নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও তদারকির কাজ করবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ঘাটতি দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
নির্দেশিকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—‘ক’ শ্রেণি ও ‘খ’ শ্রেণি। ‘ক’ শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প সংযোগব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে কোনো বিঘ্ন ঘটলেও সেবা চালু থাকে। অন্যদিকে ‘খ’ শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে উন্নীত হয়ে ‘ক’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক বিভাজন, ফায়ারওয়াল নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহজনক তথ্যপ্রবাহ শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপ লিখিতভাবে সংরক্ষণ, পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই এবং প্রয়োজনে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখতে হবে।
দূরবর্তী সংযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শক্তিশালী এনক্রিপশন, প্রমাণীকরণ এবং কার্যক্রমের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুধুমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তিদের সীমিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত যন্ত্র ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং প্রতিটি সংযুক্ত যন্ত্রে হালনাগাদ সুরক্ষা সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, ত্রুটি শনাক্তকরণ, হালনাগাদ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কোনো ধরনের সেবা বিঘ্ন বা নিরাপত্তা সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিচে নির্দেশিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | নির্দেশনার সারাংশ |
|---|---|
| নেটওয়ার্ক ধরন | এক্সট্রানেটভিত্তিক পার্টনার নেটওয়ার্ক |
| অংশগ্রহণকারী | লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান |
| শ্রেণিবিন্যাস | ‘ক’ ও ‘খ’ শ্রেণি |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | নেটওয়ার্ক বিভাজন, নজরদারি |
| প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ | সীমিত ও অনুমোদিত প্রবেশ |
| দূরবর্তী সংযোগ | এনক্রিপশন ও যাচাইকরণ বাধ্যতামূলক |
| যন্ত্র ব্যবহার | ব্যক্তিগত যন্ত্র নিষিদ্ধ |
| প্রতিবেদন | সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক জানাতে হবে |
বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই নির্দেশিকার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে অধিকতর স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
