বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্নের প্রেক্ষাপটে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সংযত থাকার নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে জ্বালানি ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংক খাতকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, শাখা ও উপশাখা পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কয়েকটি নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এসব নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং জ্বালানি ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা।
সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, অফিস চলাকালে অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার কমাতে হবে। বিশেষ করে আলো, পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) কেবল প্রয়োজনীয় সময়েই চালু রাখতে হবে। দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, যাতে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
এছাড়া অফিস ভবনে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যাংকের প্রচারমূলক ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড বা আলোকিত বিজ্ঞাপন চালু রাখা যাবে না। এতে বিদ্যুৎ অপচয় কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে অফিসিয়াল গাড়ির ব্যবহারও সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রমণে ব্যয় কমাতে বলা হয়েছে এবং সম্ভব হলে গণপরিবহন বা কার-শেয়ারিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
জেনারেটর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জেনারেটর চালু রাখা যাবে না এবং জ্বালানির ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো কার্যকর রয়েছে এবং সেটিও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাত দেশের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক খাত হওয়ায় এখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। তাই এ খাতে সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নতুন নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংক্ষেপে নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| নির্দেশনার বিষয় | করণীয় ব্যবস্থা |
|---|---|
| বিদ্যুৎ ব্যবহার | অপ্রয়োজনীয় আলো, পাখা ও এসি বন্ধ রাখা |
| প্রাকৃতিক আলো | দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারে উৎসাহ |
| আলোকসজ্জা | ভবনের অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জার আলো বন্ধ রাখা |
| ডিসপ্লে বোর্ড | নির্ধারিত সময়ের বাইরে ইলেকট্রনিক বোর্ড চালু না রাখা |
| অফিসিয়াল গাড়ি | ব্যবহার সীমিত করা |
| ভ্রমণ | অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো |
| বিকল্প যাতায়াত | গণপরিবহন ও কার-শেয়ারিং ব্যবহারে উৎসাহ |
| জেনারেটর | জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করা |
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় কমানো এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
