বাংলা চলচ্চিত্রের নব্বই দশকের দর্শকদের আবেগ, স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম—বাপ্পারাজ। পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই ছিল নীরব প্রেম, ত্যাগ আর হৃদয়ভাঙা এক গল্প। সংযত অভিনয়, ম্লান হাসি আর বিষণ্ন চোখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে তিনি এমন এক চরিত্রের প্রতীক হয়ে ওঠেন, যাকে দর্শক ভালোবেসে ডাকত ‘ব্যর্থ প্রেমের নায়ক’ কিংবা ‘মিস্টার স্যাক্রিফাইস’ নামে।
আজ ১১ মার্চ এই জনপ্রিয় অভিনেতার জন্মদিন। জানা গেছে, বিশেষ কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছাড়াই তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে দিনটি উদযাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আলোচনার কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও দর্শকদের স্মৃতিতে তার অভিনয় এখনো সমানভাবে জীবন্ত।
বাপ্পারাজের আসল নাম রেজাউল করিম। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের জ্যেষ্ঠ পুত্র। চলচ্চিত্রের পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। বাবার হাত ধরেই ১৯৮৬ সালে তিনি চলচ্চিত্রে অভিষেক করেন। রাজ্জাক পরিচালিত ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজস্ব অভিনয়ধারা গড়ে তোলেন এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
নব্বই দশকে বাংলা সিনেমায় ত্রিভূজ প্রেমের গল্প বেশ জনপ্রিয় ছিল। সেই সময়ের অনেক চলচ্চিত্রেই দেখা যেত—নায়ক নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করে প্রিয় মানুষকে অন্য কারও হাতে তুলে দিচ্ছে। এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে বাপ্পারাজ দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তার ঠোঁট মেলানো অসংখ্য গানের দৃশ্য দর্শকদের মনে গভীর আবেগ জাগায়। ‘তুমি বন্ধু আমার চির সুখে থেকো’, ‘আমি তো একদিন চলে যাব’ কিংবা ‘তোমরা সবাই থাকো সুখে’—এ ধরনের গানচিত্রে তার অভিনয় বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়।
একসময় দর্শকদের মধ্যে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিল—যে ছবিতে বাপ্পারাজ থাকবেন, সেখানে গল্পের শেষদিকে তার চরিত্রটি বেদনার করুণ পরিণতির দিকে যাবে। কিন্তু সেই বেদনার মধ্যেই তিনি দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠেন আরও প্রিয়। কারণ তার অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, সংযম এবং গভীর আবেগের মিশ্রণ।
নিচের সারণিতে নব্বই দশকে তার অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—
| চলচ্চিত্রের নাম | ধরণ | জনপ্রিয়তার কারণ |
|---|---|---|
| প্রেমের সমাধি | ত্রিভূজ প্রেম | ত্যাগী প্রেমিক চরিত্র ও আবেগঘন কাহিনি |
| প্রেমগীত | রোমান্টিক | জনপ্রিয় গান ও নাটকীয় প্রেমের গল্প |
| হারানো প্রেম | রোমান্টিক-দুঃখঘন | বিচ্ছেদ ও স্মৃতিময় প্রেমের আবহ |
| ভুলোনা আমায় | রোমান্টিক | সংযত অভিনয় ও আবেগময় উপস্থাপন |
| বুক ভরা ভালোবাসা | পারিবারিক রোমান্স | সম্পর্ক ও ত্যাগের গল্প |
| বাবা কেন চাকর | পারিবারিক | সামাজিক বার্তাধর্মী কাহিনি |
| সন্তান যখন শত্রু | পারিবারিক নাটক | পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও আবেগ |
| সৎ ভাই | পারিবারিক | সম্পর্কের টানাপোড়েন |
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও আগ্রহ দেখিয়েছেন বাপ্পারাজ। ছোট পর্দার জন্য তিনি ‘কাছের মানুষ রাতের মানুষ’ ও ‘একজন লেখক’ নামে দুটি নাটক পরিচালনা করেন। এছাড়া ‘কার্তুজ’ নামের একটি চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেছেন তিনি।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বড় পর্দায় তার উপস্থিতি কমে এলেও তিনি পুরোপুরি দূরে সরে যাননি। মাঝেমধ্যে ভিন্নধর্মী চরিত্রে তাকে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘পোড়ামন ২’ চলচ্চিত্রে নায়ক সিয়ামের বড় ভাইয়ের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বাপ্পারাজ একটি ভিন্নধর্মী নায়কোচিত চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। যেখানে নায়ক মানেই সব সময় জয়ী হওয়া নয়; কখনো কখনো ভালোবাসার জন্য ত্যাগ করাও বড় এক বিজয়। এই ব্যতিক্রমী অভিনয়ধারাই তাকে আজও দর্শকের হৃদয়ে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে।
