১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভাটি অঞ্চল তথা হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে এক আতঙ্কের নাম ছিল জগৎজ্যোতি দাস। যার বীরত্বগাথা আজও সুরমা-কুশিয়ারা তীরের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর, পবিত্র ঈদুল ফিতরের মাত্র চার দিন আগে, এই অকুতোভয় যোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন যোদ্ধার প্রস্থান ছিল না, বরং তা ছিল অমানবিক নির্যাতনের এক চরম নিষ্ঠুর দলিল।
Table of Contents
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
জগৎজ্যোতি দাস ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস এবং মাতার নাম হরিমতি দাস। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও সাহসী হিসেবে পরিচিত এই তরুণ ১৯৬৮ সালে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। দেশপ্রেমের টানে তিনি ভারতের আসামে গিয়ে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দেশ স্বাধীন করার দৃপ্ত শপথ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
কিংবদন্তি ‘দাসপার্টি’ ও রণকৌশল
শিলংয়ে প্রশিক্ষণ শেষে জগৎজ্যোতি দাস গঠন করেন ঐতিহাসিক ‘দাসপার্টি’। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চল— বিশেষ করে দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং এবং তাহিরপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তাঁর গেরিলা আক্রমণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল— “এই রুট দিয়ে যাতায়াতকারী জানমালের কোনো দায়ভার সরকার গ্রহণ করবে না।” মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে ২৫০ জন সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাকে পরাস্ত করা কিংবা ১০-১২ জন নিয়ে শ্রীপুর শত্রুমুক্ত করার মতো ঘটনাগুলো তাঁর সামরিক কৌশলের অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।
জগৎজ্যোতি দাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও অবদান
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম তারিখ ও স্থান | ২৬ এপ্রিল ১৯৪৯; জলসুখা গ্রাম, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ। |
| পিতা ও মাতার নাম | জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও হরিমতি দাস। |
| গেরিলা দলের নাম | দাসপার্টি। |
| অপারেশন এলাকা | সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাওর ও ভাটি অঞ্চল। |
| উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব | পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে দেওয়া। |
| প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় খেতাব | বীর বিক্রম (মরণোত্তর)। |
| মৃত্যু ও তারিখ | ১৬ নভেম্বর ১৯৭১; বদলপুর, আজমিরীগঞ্জ। |
সেই কালো দিন: ১৬ নভেম্বর ১৯৭১
১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর বাহুবল অভিযানে যাওয়ার পথে আজমিরীগঞ্জের বদলপুরে রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত অ্যাম্বুশে পড়ে যান জগৎজ্যোতি ও তাঁর ৪২ জন সহযোদ্ধা। রণক্ষেত্রে অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করলেও একপর্যায়ে তিনি ধরা পড়েন। তৎকালীন সময়ে রাজাকাররা তাঁকে বন্দি করার পর যে বর্বরতা চালিয়েছিল, তা মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।
অর্ধমৃত অবস্থায় তাঁকে আজমিরীগঞ্জ গরুর হাটে বিদ্যুতের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়। এরপর তাঁর শরীরে পেরেক ঠুকে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। দীর্ঘক্ষণ নিথর দেহটি খুঁটিতে ঝুলে থাকার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানি দোসররা তাঁর মরদেহটি কোনো প্রকার সৎকার না করেই কুশিয়ারা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই চরম আত্মত্যাগের সংবাদটি তৎকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়েছিল।
খেতাব সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট
জগৎজ্যোতি দাসের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মুজিবনগর সরকার (অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার) তাঁকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। এমনকি আকাশবাণী কলকাতা থেকেও জানানো হয়েছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে ভূষিত করবে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও তাঁর নামের আগে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ বিশেষণটি ব্যবহৃত হতো। তবে ১৯৭২ সালে সরকারি গেজেটে তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ উপাধি প্রদান করা হয়। যদিও এই বীরকে সাধারণ মানুষ এবং ইতিহাসবিদরা প্রায়শই ‘খেতাববিহীন বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে অভিহিত করেন, তাঁর অসামান্য অবদান আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
