মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA)-র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ‘থাড’ (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি রাডার ইউনিট সফলভাবে ধ্বংস করেছে ইরান। নিখুঁত লক্ষ্যভেদে সক্ষম প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অভিযানের বিবরণ ও কৌশলগত হামলা
আইআরজিসি-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে প্রতিহত করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অবস্থানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যে শক্তিশালী রাডার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। ইরানের অত্যাধুনিক প্রিসিশন-গাইডেড বা দূরপাল্লার নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতে আঘাত হানে।
ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, রাডার হলো যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘চোখ’। এই রাডারগুলো ধ্বংস করার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট থাড ব্যাটারিগুলো এখন আর ধেয়ে আসা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত বা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বলয়কে বড় ধরনের ছিদ্রের মুখে ফেলে দিয়েছে।
থাড (THAAD) ব্যবস্থা ও এর গুরুত্ব
‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড হলো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি মূলত বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এবং বাইরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। এর রাডার ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী, যা অনেক দূর থেকেই শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত কারিগরি তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| পূর্ণরূপ | টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD) |
| মূল কাজ | স্বল্প, মাঝারি ও মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা |
| প্রস্তুতকারক | লকহিড মার্টিন (যুক্তরাষ্ট্র) |
| রাডার সক্ষমতা | এএন/টিপিওয়াই-২ (AN/TPY-2) রাডার, যা ১০০০ কিমি দূরেও লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে |
| হামলার ধরণ | সরাসরি আঘাতের মাধ্যমে (Hit-to-kill technology) |
| ধ্বংসকৃত রাডার সংখ্যা | ৪টি (ইরানের দাবি অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায়) |
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সামরিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ
ইরানের এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি তাদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণেরও একটি চেষ্টা। প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে থাড-এর মতো উচ্চ প্রযুক্তির রাডার ধ্বংস করা প্রমাণ করে যে, ইরানের কাছে এমন প্রযুক্তি রয়েছে যা পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর এই ধরনের সরাসরি আক্রমণ দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ইরানের এই দাবি সত্য হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল আমূল পরিবর্তন করতে হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এবং তার মিত্র দেশগুলোর ওপরও এর মানসিক প্রভাব পড়বে, কারণ তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য অনেকাংশেই এই মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। পেন্টাগন থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসলেও ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। ইরানের এই দাবি সত্য হলে তা হবে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা যুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি বাঁক।
