দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ আর্থিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে সম্ভাব্য মুনাফা তলানিতে ঠেকায় অনেক ব্যাংক এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে ভুগছে।
প্রভিশন ঘাটতির বর্তমান চিত্র ও পরিসংখ্যান
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মোট চার লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো মাত্র দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে বিশাল অংকের এই পরিমাণে। তবে এই সংকটের মধ্যেও বিদেশি ব্যাংকগুলো ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে; তাদের কোনো ঘাটতি নেই, বরং ৩৩৮ কোটি টাকার প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে।
খাতভিত্তিক প্রভিশন ঘাটতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| ব্যাংকের ধরণ | ঘাটতির পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক | ১,২১,২১৪.১৯ |
| রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক | ৭০,৩৬৪.৪৪ |
| বিশেষায়িত ব্যাংক | ২০১.০২ |
| মোট ঘাটতি | ১,৯১,৭৮০.০০ |
খেলাপি ঋণের প্রভাব ও নীতিমালার জটিলতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী, নিয়মিত ঋণের বিপরীতে ০.৫ থেকে ৫ শতাংশ এবং শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশই এখন আদায় অযোগ্য বা খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০০৯ সালে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, সেখানে দীর্ঘ দেড় দশকে নানা রাজনৈতিক শিথিলতা ও নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ায় এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রবর্তিত ঋণ পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর খেলাপি করার নীতিকে অনেকে ‘কাগুজে লাভ’ দেখানোর চুরির সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “প্রভিশন ঘাটতি সরাসরি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর আঘাত হানে। যখন একটি ব্যাংকের মূলধন কমে যায়, তখন তার নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা সংকুচিত হয়, যা সরাসরি দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে, যার ফলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের টাকা ফেরত পেতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। যদি এখনই কার্যকর সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, বিগত সরকারের সময়কার অর্থপাচার ও বেনামি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদী এবং স্বচ্ছ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
