এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে খেলতে গেলে প্রস্তুতির মান যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি সেই বাস্তবতাই নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে। সীমিত প্রস্তুতি এবং তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লিগ খেলে আন্তর্জাতিক শক্তিশালী দলের সামনে দাঁড়ালে যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের ৫–০ গোলের পরাজয়ে। তবে এই হারকে শুধুমাত্র পরাজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সামনে এখনো উজবেকিস্তানের বিপক্ষে একটি ম্যাচ বাকি। যদি সেই ম্যাচে জয় আসে, তবু বড় অর্জন হবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ এশিয়ার সীমা পেরিয়ে উচ্চমানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে গেলে কেমন প্রস্তুতি দরকার, কী ধরনের কৌশল প্রয়োজন—এসব বিষয়ও নতুন করে ভাবার সুযোগ পাচ্ছে দলটি।
গ্রুপ পর্বে চীনের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবল খেলেছিল। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ, লং পাস ও ক্রসের মাধ্যমে চীনের আক্রমণ ঠেকিয়ে মাঝে মাঝে পাল্টা আক্রমণও গড়েছিল দলটি। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে সেই দৃশ্য আর দেখা যায়নি। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকা উত্তর কোরিয়া বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে একের পর এক চাপের মুখে ফেলেছে।
পুরো ম্যাচে উত্তর কোরিয়া বাংলাদেশের গোলমুখে মোট ৩১টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি। পরিসংখ্যানই বলে দেয় ম্যাচে দুই দলের মধ্যে পার্থক্য কতটা ছিল।
নিচে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো—
| পরিসংখ্যান | বাংলাদেশ | উত্তর কোরিয়া |
|---|---|---|
| গোল | ০ | ৫ |
| মোট শট | ০ | ৩১ |
| লক্ষ্যে শট | ০ | ১১ |
| বল দখল (আনুমানিক) | কম | বেশি |
| কর্নার | ১ | ৮ |
বাংলাদেশের গোলকিপার মিলি আক্তার এই ম্যাচে দলের অন্যতম উজ্জ্বল পারফরমার। পাঁচটি গোল হজম করলেও তিনি আরও কয়েকটি নিশ্চিত গোল ঠেকিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতায়। তাঁর দৃঢ়তা না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
রক্ষণভাগেও কিছু ইতিবাচক দিক ছিল। শামসুন্নাহার সিনিয়র, নবীরণ খাতুন, আইরিন খাতুন, কোহাতি কিসকু এবং আফঈদা খন্দকার শুরুতে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলাতে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। বিশেষ করে দুই প্রান্ত দিয়ে আসা আক্রমণ ঠেকাতে লেফটব্যাক শামসুন্নাহার এবং রাইটব্যাক কোহাতি বেশ কয়েকবার কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।
প্রথমার্ধে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে রক্ষণভাগের পাঁচজনের সঙ্গে মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা ও মনিকা চাকমাকেও রক্ষণে সহায়তা করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ কিছুটা গুছিয়ে খেলার চেষ্টা করলেও আক্রমণভাগ কার্যত নিষ্ক্রিয়ই ছিল।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত উইং দিয়ে আক্রমণ, ক্রস এবং দূরপাল্লার শট থেকে সুযোগ তৈরি করে তা গোলেও পরিণত করেছে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা নিজেদের পায়ে বল ধরে রাখতে পারেনি এবং আক্রমণ গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের মানদণ্ডে উত্তর কোরিয়া একটি শক্তিশালী দল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তারা বাংলাদেশের চেয়ে ১০৩ ধাপ এগিয়ে। চারবার নারী বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এই দলটি এশিয়ান কাপে দশবার খেলেছে এবং তিনবার শিরোপা জিতেছে। সাম্প্রতিক দশ ম্যাচে তাদের পরাজয় মাত্র একটি।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ৫–০ গোলের হার শুধু একটি ফলাফল নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজানোর একটি উপলক্ষ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ এবং উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই দলটিই আগামী দিনে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
