হরমুজ প্রণালিতে জাহাজজট: বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাসংকটের কালো মেঘ

ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভূ-রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থার সম্মুখীন। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সংকীর্ণ জলপথের দুই প্রবেশমুখে শত শত বিশালাকার জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের তীব্র আশঙ্কা তৈরি করেছে।

জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যে ভয়াবহ চিত্র

আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১৫০টি বিশালাকার সুপার-ট্যাংকার বর্তমানে পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে খোলা সমুদ্রে নোঙর করে অপেক্ষা করছে। এসব জাহাজের সিংহভাগই সৌদি আরব, কুয়েত এবং ইরাক থেকে অপরিশোধিত তেল এবং কাতার থেকে এলএনজি বহন করছে। যুদ্ধঝুঁকি এড়াতে জাহাজগুলো বর্তমানে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিচ্ছে।

কেন এই প্রণালিটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ‘ধমনী’। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়, তার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বে নেই। নিচের সারণিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও বর্তমান সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিষয়ের ক্ষেত্রবৈশ্বিক গুরুত্ব ও বর্তমান পরিসংখ্যানসম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব
দৈনিক তেল সরবরাহবিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।বাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়ানোর ঝুঁকি।
এলএনজি সরবরাহবৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।
আটকা পড়া জাহাজমেরিন ট্রাফিক মতে ১৫০+ বৃহৎ ট্যাংকার।শিপিং বীমা ও পরিচালনা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া।
বিকল্প রুটঅত্যন্ত সীমিত ও ব্যয়বহুল।বৈশ্বিক লজিস্টিক চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।

বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা

শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা যদি আর এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করবে। বর্তমানে ওমান সাগরে অপেক্ষমাণ এই বিশাল জাহাজ বহরকে বিশ্লেষকরা ‘ভাসমান তেলের পাহাড়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কাতার এনার্জি এবং সৌদি আরামকোর মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে তাদের বেশ কিছু কার্গোর রুট পরিবর্তন বা স্থগিত করার কথা ভাবছে।

এই সংকটের প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দেবে, যার ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা নতুন করে এক বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) জন্ম দেবে। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো, যেমন চীন, ভারত ও জাপান সবচেয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।

উপসংহার

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক শীর্ষ শিপিং কোম্পানি ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার ঘোষণা দিয়েছে। যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই জলপথ দ্রুত নিরাপদ করা না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার কবলে পড়বে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আপদকালীন মজুত ব্যবহারের কথা ভাবছে। তবে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তা কোনো মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।