ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে এক নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সংকটের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ রুট হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’ ইরান বন্ধ ঘোষণা করার পর তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলার স্পর্শ করেছে।
হরমুজ প্রণালী ও সরবরাহ সংকট
বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয় পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে হলো বিশ্ববাজারের ধমণী বন্ধ হয়ে যাওয়া। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই দাম খুব দ্রুত ১০০ ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি গবেষণা সংস্থা ‘রাইস্ট্যাড এনার্জি’ (Rystad Energy) তাদের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় জানিয়েছে, সোমবার (২ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তেলের এই আকাশচুম্বী দামের পেছনে মূল কারণ হলো প্রতিদিন বাজারে বিশাল পরিমাণ তেলের ঘাটতি।
নিচে জ্বালানি তেলের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রভাবের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান | সম্ভাব্য প্রভাব |
| বর্তমান দাম | ব্যারেল প্রতি ৮০ মার্কিন ডলার (১০% বৃদ্ধি) | পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। |
| দৈনিক সরবরাহ ঘাটতি | ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল | বিশ্বজুড়ে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়া। |
| হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব | দৈনিক ১.৫ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন | বিকল্প রুটের অভাব ও সরবরাহ স্থবিরতা। |
| বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস | ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়ানোর শঙ্কা | দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি। |
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
এনার্জি ও রিফাইনিংয়ের (আইসিআইএস) ডিরেক্টর অজয় পারমার পরিস্থিতির ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, সামরিক হামলা তেলের দাম বাড়ালেও এবারের মূল সংকট হলো হরমুজ প্রণালী। যদি এই জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার কবলে পড়বে। তেলের দাম বাড়লে কেবল জ্বালানি খরচ বাড়ে না, বরং এর প্রভাবে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ২০ ডলার বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে, যা দেশীয় মুদ্রার মান কমিয়ে দেবে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি অশনি সংকেত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ববাসী এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
