সুনামগঞ্জে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ: যুবকের যাবজ্জীবন

সুনামগঞ্জে এক কলেজছাত্রীকে প্রবাসী সেজে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ে মহিবুর রহমান নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। আজ রোববার সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং অনাদায়ে আরও মেয়াদের সাজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সুপরিকল্পিত প্রতারণা

মামলার নথিপত্র ও বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দণ্ডপ্রাপ্ত মহিবুর রহমান সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের তেরাপুর গ্রামের গৌছ আলীর ছেলে। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিজেকে ফ্রান্স প্রবাসী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ছাতক পৌর শহরের এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে সখ্যতা গড়ে তোলেন। প্রতারক মহিবুর নিজেকে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক দাবি করে ভুক্তভোগী তরুণীকে প্রেমের জালে আবদ্ধ করেন এবং তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখান।

কিছুদিন পর মহিবুর নাটকীয়ভাবে জানান যে তিনি দেশে ফিরেছেন এবং তরুণীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করার প্রস্তাব দেন। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর মহিবুর তাঁর এক সহযোগীর সহায়তায় ওই ছাত্রীকে ফুসলিয়ে ছাতক পৌর শহরের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে বিয়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তিনি তরুণীকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেন। এই পাশবিক কর্মকাণ্ডের এখানেই শেষ নয়; মহিবুর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধর্ষণের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেন এবং বেশ কিছু আপত্তিকর স্থিরচিত্র তুলে রাখেন।

মামলার মূল তথ্য ও বিচারিক ফলাফল

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
আদালতের নামনারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সুনামগঞ্জ
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিমহিবুর রহমান (পিতা: গৌছ আলী)
অপরাধের প্রকৃতিধর্ষণ, ভিডিও ধারণ ও পর্নোগ্রাফি আইনের লঙ্ঘন
মূল দণ্ডাদেশযাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড
আর্থিক দণ্ড১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা জরিমানা
জরিমানার অর্থ প্রাপকভুক্তভোগী নির্যাতিতা কলেজছাত্রী
আসামির বর্তমান অবস্থাপলাতক (আদালতে অনুপস্থিত)

সামাজিক লাঞ্ছনা ও আইনের আশ্রয় গ্রহণ

ধর্ষণের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কিছুকাল পরেই তিনি জানতে পারেন যে মহিবুর কখনোই ফ্রান্সে ছিলেন না এবং তাঁর সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় সবই ছিল সাজানো ও মিথ্যা। প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তরুণী মহিবুরের সঙ্গে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মহিবুর। সে প্রতিশোধ নিতে ধারণকৃত সেই গোপন ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের ওপর চরম সামাজিক অবমাননা ও মানসিক চাপ নেমে আসে।

তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক লোকলজ্জা উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ওই তরুণী ছাতক থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। আদালত দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করে আজ এই দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদান করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও জননিরাপত্তা

সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শামসুর রহমান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, বিচারক তাঁর রায়ে এই অপরাধকে ‘ক্ষমার অযোগ্য’ এবং ‘সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে একজন নারীর সম্ভ্রমহানি করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার বিরুদ্ধে এই রায় একটি শক্তিশালী বার্তা। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জরিমানার অর্থ অবশ্যই ভুক্তভোগী নারীকে প্রদান করতে হবে।

বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মহিবুর রহমান পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সাজা কার্যকর করার লক্ষে আসামিকে গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরা।