খামেনির মৃত্যুতে পরিবর্তনের বার্তা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা শাহ পাহলভী এক বিস্তৃত বিবৃতি প্রদান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধে তিনি খামেনির মৃত্যুকে ইরানের জনগণের জন্য “ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে চলমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার অবসান দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

নিবন্ধের সূচনাতেই পাহলভী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।” পাহলভীর মতে, এই বক্তব্য ইরানি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক সমর্থনের প্রতিফলন। তিনি দাবি করেন, ইরানের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে আসছে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন নিয়ে সমালোচনা

পাহলভী তাঁর নিবন্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই সরকার আঞ্চলিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে এবং বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তারের নীতি অনুসরণ করেছে। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন আন্তর্জাতিক পরিসরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

তবে তাঁর মতে, সবচেয়ে গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং নাগরিক অধিকার সংকোচনের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় বহু মানুষের প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শতাধিক মানুষ নিহত এবং হাজারের বেশি মানুষ আটক হন। পাহলভীর ভাষায়, “রাষ্ট্রযন্ত্রের দমননীতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।”

প্রস্তাবিত রাজনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা

ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাহলভী একটি সুসংগঠিত রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, একটি শান্তিপূর্ণ ও গণভিত্তিক রূপান্তর প্রক্রিয়া ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর প্রস্তাবিত ধাপসমূহ নিম্নরূপ—

প্রস্তাবিত ধাপবিস্তারিত বিবরণ
অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনবিভিন্ন মত ও দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যভিত্তিক অস্থায়ী সরকার
নতুন সংবিধান প্রণয়নজনগণের মতামতের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান খসড়া এবং গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণনিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনবহুদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার নির্বাচন

পাহলভী জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকা উচিত। তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামোর আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য প্রভাব

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভী পরিবারের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে এবং এরপর থেকেই রেজা শাহ পাহলভী বিদেশে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে মত প্রকাশ করে আসছেন। খামেনির মৃত্যু দেশের ক্ষমতার কাঠামোতে এক নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পাহলভী তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেন, “ইতিহাস কখনো কখনো হঠাৎ করেই জাতির সামনে পরিবর্তনের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।” তাঁর এই মন্তব্য ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান সময়কে তিনি একটি ঐতিহাসিক মোড়বদলের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন। এখন দেখার বিষয়, ইরানের জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগায় এবং দেশটি কোন পথে অগ্রসর হয়।