খাগড়াছড়ির চেঙ্গি নদীর তীরে প্রতি বছর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি হয়। এক পাশে হরিত পাহাড়ের ঢালু ভূমি, অন্য পাশে প্রশস্ত সূর্যমুখী ক্ষেত, যা হাওয়া সহ বাতাসে দুলে ওঠে। এই দৃশ্য দেখার জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসেন, কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে নয়, বরং ছবি তোলার জন্য এবং প্রাণবন্ত পরিবেশে সময় কাটাতে।
সম্প্রতি, দুই স্থানীয় কৃষক—আপ্রে মার্মা ও নিরুত্তম চাকমা—তাদের সূর্যমুখী বাগানকে লাভজনক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রূপ দিয়েছেন। তারা দর্শনার্থীদের জন্য একটি সামান্য প্রবেশ ফি নির্ধারণ করেছেন, যা কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয় হিসেবে কাজ করছে।
Table of Contents
দর্শনার্থীদের চাপ ব্যবস্থাপনা
প্রাথমিকভাবে, দর্শনার্থীদের আগমন কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। অনেকবার রিপোর্ট পাওয়া যায় যে, ফুল কেটে নেওয়া হচ্ছে এবং গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে কৃষকরা প্রবেশ ফি নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আপ্রে মার্মা বলেন,
“প্রথমে দর্শনার্থীরা ফুল কেটে নিতো এবং গাছ ভেঙে দিতো। একদিন হতাশ হয়ে ২০ টাকা প্রবেশ ফি নির্ধারণ করলাম। এরপর দর্শনার্থীরা স্বেচ্ছায় ফি দিচ্ছে এবং অনেকেই ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছে।”
নিরুত্তম চাকমা জানালেন, গত বছর তিনি টিকেট বিক্রি থেকে ১০,০০০ টাকা আয় করেছেন। এই বছর দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আয় আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপ্রে মার্মা আগামী বছরে আরও এক একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করার পরিকল্পনা করছেন।
কৃষকের বাগান ও আয় বিবরণ
| কৃষকের নাম | অবস্থান | জমির পরিমাণ | প্রবেশ ফি (প্রতি দর্শক) | অতিরিক্ত আয় (টিকেট বিক্রি) | ফুলের মূল্য (প্রতি স্টেম) |
|---|---|---|---|---|---|
| আপ্রে মার্মা | বট্টলী, চেঙ্গি নদীর ধারে | ২০ শতাংশ | ২০ টাকা | এ বছরের জন্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত | ১৫০ টাকা |
| নিরুত্তম চাকমা | খাবংপুরিয়া, চেঙ্গি নদীর ধারে | ৪০ শতক | ৫০ টাকা | ১০,০০০ টাকা (গত বছর) | — |
দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
দর্শনার্থীরা এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আনন্দিত। মতিরাঙ্গা উপজেলার রোকসানা আক্তার বললেন,
“দীর্ঘদিন ধরে সূর্যমুখী বাগান দেখার ইচ্ছা ছিল। ২০ টাকা প্রবেশ ফি দেওয়া পুরোপুরি সার্থক। এত বড় ক্ষেত এত কাছ থেকে দেখার আনন্দ অপরিসীম।”
খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী অনুপ্রভা চাকমা উল্লেখ করলেন,
“কলেজের কাছাকাছি থাকায় আমি সময় পেলেই এখানে আসি। প্রবেশ ফি দিলেও ছবি তোলা এবং সময় কাটানো পুরোপুরি মূল্যবান।”
কৃষি সহায়তা
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৪০ হেক্টর জমি সূর্যমুখী চাষের জন্য প্রণোদনা পেয়েছিল। এ বছর ৩৭ হেক্টর সমর্থন পেয়েছে। যদিও অনেক কৃষক সূর্যমুখী চাষ করেন, নদীর তীর ও পাহাড়ের ঢালে বড় আকারের চাষ বিরল। এ কারণেই আপ্রে ও নিরুত্তম মার্মার বাগানে দর্শক প্রবাহ এত বেশি।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মুকতা চাকমা জানান, মাটি সূর্যমুখীর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তিনি বলেন,
“আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করছি। সূর্যমুখীর তেল উৎপাদন সোয়াবিন তেলের আমদানি কমাতে সাহায্য করবে।”
আজ চেঙ্গি নদীর ধারের সূর্যমুখী বাগান কেবল কৃষি জমি নয়, বরং স্থানীয় পর্যটন ও আয় বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
