ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার চলমান যুদ্ধে আকাশপথের লড়াই এখন এক নতুন ও বিধ্বংসী মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার রিমোট-কন্ট্রোলড ড্রোন বা দূরনিয়ন্ত্রিত চালকবিহীন বিমানের আক্রমণ ঠেকাতে ইউক্রেন সরকার এক অভিনব ও বিশাল প্রতিরক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বুধবার ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ডিজিটাল রূপান্তর বিষয়ক মন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ ঘোষণা করেছেন যে, দেশটির সম্মুখ সমরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথগুলোতে রুশ ড্রোন প্রতিরোধক জাল স্থাপনের কাজ দ্রুততর করা হবে। চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়ক এই বিশেষ সুরক্ষাবলয়ের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুদ্ধের কৌশল ও ড্রোনের ভয়াবহতা
রাশিয়ান বাহিনী বর্তমানে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউক্রেনের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা, পেছনের ঘাঁটি এবং লজিস্টিক রুটগুলোকে ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু করছে। এই ড্রোনগুলো কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই নয়, বরং বেসামরিক হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সাধারণ যানবাহনেও আঘাত হানছে। ড্রোন আক্রমণের এই ভয়াবহতা থেকে রেহাই পেতে ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা গত বছর থেকেই ফ্রন্ট লাইন বা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি সড়কগুলোর ওপর শক্তিশালী জালের ছাউনি দেওয়া শুরু করেছেন। এই বিশেষ জালগুলো মূলত ড্রোনের প্রপেলার বা পাখাকে আটকে দেয়, যার ফলে ড্রোনটি বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই অকেজো হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। এতে উচ্চমূল্যের সামরিক সরঞ্জাম, সেনা সদস্য এবং বেসামরিক জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রকল্পের গতি ও বরাদ্দকৃত বাজেট
প্রতিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে ইউক্রেনীয় প্রশাসন বাজেটে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করেছে। মিখাইলো ফেদোরভ জানিয়েছেন, সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত ১.৬ বিলিয়ন হৃভনিয়া (যা প্রায় ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে মূলত জালের উপাদান ক্রয় এবং দ্রুত স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হবে।
নিচে ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিরোধক জাল প্রকল্পের অগ্রগতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সময়কাল (২০২৬) | প্রতিদিন জাল স্থাপনের হার (কিমি) | লক্ষ্যমাত্রা ও প্রভাব |
| জানুয়ারি | ৫ কিলোমিটার | প্রকল্পের প্রাথমিক ধীর গতি। |
| ফেব্রুয়ারি | ১২ কিলোমিটার | সামরিক চলাচলের নিরাপত্তা বৃদ্ধি। |
| মার্চ (পরিকল্পিত) | ২০ কিলোমিটার | সড়ক আচ্ছাদনের গতি প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি। |
| বছরের শেষ নাগাদ | মোট ৪,০০০ কিলোমিটার | সম্মুখ সমরের লজিস্টিক রুটের পূর্ণ সুরক্ষা। |
কৌশলগত সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
টেলিগ্রাম অ্যাপে দেওয়া এক বার্তায় ফেদোরভ উল্লেখ করেন যে, জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন মাত্র পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ঢাকা সম্ভব হলেও ফেব্রুয়ারিতে সেই গতি বাড়িয়ে ১২ কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে ফ্রন্ট লাইনের সংলগ্ন জনপদগুলোর স্থিতিশীলতা এবং সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সড়ক সুরক্ষার পাশাপাশি ইউক্রেন রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ ও সুমি অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলেও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত রুশ বাহিনীর সম্ভাব্য স্থল আক্রমণ এবং ড্রোন অনুপ্রবেশের পথগুলো বন্ধ করতেই এই সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ড্রোন শিল্ড’ বা সুরক্ষা জাল আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের একচেটিয়া প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী মডেল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। ইউক্রেন আশা করছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আকাশপথের অসম লড়াইয়ে তারা অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
