বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে ব্যাপক রদবদল এবং সংস্কার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য প্রদান করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি। আজ বুধবার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করছে এবং পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের প্রভাবশালী শক্তির বলয়গুলো ভেঙে দিচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক আধিপত্যের পতন
গোলাম মাওলা রনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গত কয়েকদিন ধরে বিএনপি সরকার অনেকটা ঝড়ের গতিতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গত ১৭ মাসে গড়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি-র (জাতীয় নাগরিক পার্টি) দুর্গগুলো তছনছ হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যারা জামায়াত বা এনসিপি-র আদর্শের অনুসারী ছিলেন, বর্তমান সরকার তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ করছে।
তিনি বলেন, “গত কয়েক দিনের মধ্যে মোটামুটি একটা দফারফা হয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী এবং সিটি করপোরেশনের মতো জায়গাগুলোতে জামায়াত-এনসিপি-র যে ব্যাপক আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি চুরমার করে দেওয়া হয়েছে।” রনির মতে, অনেক কর্মকর্তা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিজ ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করছেন, আবার অনেককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের তৎপরতা ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে রনি বলেন, তিনি ক্ষমতায় বসার পর থেকে একের পর এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত ও চমক সৃষ্টি করে চলেছেন। আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এবং পরবর্তী ১৭ মাসের প্রশাসনিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে মন্ত্রীরা এখন দৃশ্যমান তৎপরতা দেখাচ্ছেন।
নিচে প্রশাসনিক পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী আমলের অবস্থা | বর্তমান বিএনপি সরকারের পদক্ষেপ |
| মন্ত্রণালয় | প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা | কাজের গতি বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ |
| পুলিশ প্রশাসন | নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব | আধিপত্য খর্ব ও ব্যাপক রদবদল |
| সিটি করপোরেশন | জামায়াত-এনসিপি-র দুর্ভেদ্য নিয়ন্ত্রণ | প্রশাসনিক সংস্কার ও নতুন নেতৃত্বায়ন |
| নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি | বাস্তবায়নের ধীরগতি বা অনিশ্চয়তা | দ্রুত বাস্তবায়নের দৃশ্যমান পরিকল্পনা ও কাজ |
আগামীর রাজনীতি ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
গোলাম মাওলা রনির এই বিশ্লেষণ মূলত বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের চিত্রটি ফুটিয়ে তোলে। তিনি মনে করেন, বিএনপি সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষায় এখন অত্যন্ত আন্তরিক এবং তা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসনের এই “ঝেঁটিয়ে বিদায়” করার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে বা এতে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা রয়েছে।
রনি তাঁর আলোচনায় আরও যোগ করেন যে, বিগত শাসনামলগুলোর অভিযোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান মন্ত্রীরা তাঁদের নিজ নিজ দপ্তরের স্থবিরতা কাটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই। যদি সরকার এই গতি ধরে রাখতে পারে, তবে জনগণের আস্থা অর্জন সহজ হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সামগ্রিকভাবে, গোলাম মাওলা রনির বক্তব্যে প্রশাসনের প্রতিটি কোণ থেকে পূর্ববর্তী শক্তির অবশিষ্টাংশ নির্মূল করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।
