ফুটবল বিশ্বের চিরন্তন বিতর্ক ‘সর্বকালের সেরা কে?’—এই প্রশ্নে যখন লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ জয়কে বড় মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তখন পর্তুগাল জাতীয় দলের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ এক ভিন্নধর্মী ও জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ট্রফি বা বিশ্বকাপ জয় দিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মহাতারকাকে বিচার করা অনুচিত। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে মার্তিনেজ দাবি করেছেন, রোনালদোর ফুটবলীয় প্রভাব ও লিগ্যাসি এতটাই বিশাল যে, বিশ্বকাপ না জিতলেও তিনি ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের সেরার আসনেই আসীন থাকবেন।
Table of Contents
শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড কেবল একটি ট্রফি নয়
পর্তুগাল ফুটবল সামিট পডকাস্টে কথা বলার সময় স্প্যানিশ কোচ মার্তিনেজ রোনালদোর পেশাদারিত্ব ও নিবেদনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের শীর্ষ স্তরে আধিপত্য বিস্তার করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। মেসির ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ফুটবল দুনিয়ায় যে ‘সেরা’র বিতর্ক থেমে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়, মার্তিনেজ তাকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, রোনালদোর ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, ফিটনেস এবং গোলের ক্ষুধার মধ্যে।
মার্তিনেজ বলেন, “রোনালদোকে যদি আমরা চিরকাল পেতাম, তবে জাতীয় দলে নতুন যারা আসে, তাদের পথ দেখানো অনেক সহজ হতো।” তিনি আরও যোগ করেন যে, উন্নতির প্রতি রোনালদোর অদম্য স্পৃহা এবং কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা তাকে অন্য যে কোনো ফুটবলারের থেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
পরিসংখ্যানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মহাকাব্যিক ক্যারিয়ার
রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল মুখের কথায় নয়, বরং সংখ্যাতত্ত্বের বিচারেও প্রমাণিত। নিচে তাঁর ফুটবলীয় ক্যারিয়ারের কিছু অভাবনীয় অর্জন টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো:
| ক্যাটাগরি | পরিসংখ্যান/তথ্য | মন্তব্য |
| মোট গোল (ক্লাব ও জাতীয় দল) | ৯৬৪টি | ১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে মাত্র ৩৬ গোল দূরে। |
| ব্যালন ডি’অর | ৫টি | ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মাননা। |
| জাতীয় দলের গোল | ১৩৫+ গোল (সর্বোচ্চ) | আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। |
| চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা | ৫টি | আধুনিক ফুটবলের রাজা হিসেবে পরিচিত। |
| ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ | ২০১৬ (শিরোপাজয়ী) | পর্তুগালের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। |
| বয়স ও ফিটনেস | ৪১ বছর | ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার দোরগোড়ায়। |
২০২৬ বিশ্বকাপ ও রোনালদোর লক্ষ্য
পর্তুগালের হয়ে শেষ ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল করা প্রমাণ করে যে, ৪১ বছর বয়সেও রোনালদোর ধার কমেনি বরং বেড়েছে। তিনি এখন একই সাথে দলের প্রধান গোলদাতা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণাদাতা মেন্টর। মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগাল দল এখন আরও বেশি গোছানো, যেখানে রোনালদোকে কেন্দ্র করেই সাজানো হচ্ছে আক্রমণভাগ।
যদিও মার্তিনেজ ট্রফি ছাড়াও রোনালদোকে সেরা মানেন, কিন্তু সিআরসেভেনের নিজের লক্ষ্য কিন্তু ভিন্ন। ফুটবল বিধাতার কাছে তাঁর হয়তো একটাই চাওয়া—বিদায়ের আগে সোনালি ট্রফিটা একবারের জন্য হলেও ছোঁয়া। তিনি ভালো করেই জানেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে তাঁর শেষ সুযোগ।
লিগ্যাসি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
রবার্তো মার্তিনেজের মতে, রোনালদো ফুটবলারদের জন্য একটি ‘লিভিং লেজেন্ড’। তাঁর কাজের নৈতিকতা (Work Ethics) এবং সাফল্যের প্রতি অবিচল থাকা তরুণদের শেখায় কীভাবে দীর্ঘ সময় শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকতে হয়। রোনালদো তাঁর ক্যারিয়ারে ৩টি ভিন্ন দেশের ৪টি লিগে দাপট দেখিয়েছেন এবং সবখানেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এই বৈচিত্র্যময় সাফল্যই তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অনন্য এক নায়কে পরিণত করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ট্রফি ক্যাবিনেটে বিশ্বকাপের অভাব থাকলেও, গোল করার সংখ্যা, শারীরিক সক্ষমতা এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মনে তাঁর যে জায়গা, তা তাঁকে চিরকাল ফুটবলের অমরদের সারিতেই রাখবে। রবার্তো মার্তিনেজের এই জোরালো সমর্থন মূলত সেই সত্যকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করলো।
