মানুষ সাধারণত রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকে উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশায়। যখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখন অসন্তোষ জমে ওঠে—যা কখনো কখনো বিস্ফোরিত হয়ে গণবিক্ষোভ বা বিপ্লবে রূপ নেয়। ইতিহাস বলছে, এমন বহু বিপ্লব ক্ষমতার কাঠামো বদলে দিয়েছে। তবে বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচন হলেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সব দেশে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে পাঁচটি দেশের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
শ্রীলঙ্কা: অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তন
২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে শ্রীলঙ্কা। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ জনগণের ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশত্যাগে বাধ্য হন।
এরপর ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক বিজয়ী হন এবং তার দল ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটি তুলনামূলক স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বড় ধরনের অস্থিরতার খবর কমে এসেছে।
তিউনিসিয়া: আরব বসন্তের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
২০১০ সালে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের সূতিকাগার তিউনিসিয়া। ২০১১ সালে জয়নাল আবেদিন বিন আলির পতনের পর প্রথমবারের মতো অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু হলেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশটি আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও জনগণের আর্থসামাজিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা ‘জুঁই বিপ্লবের’ সাফল্যকে ম্লান করেছে।
মিশর: বিপ্লব থেকে পুনরায় কর্তৃত্ববাদ
২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন। পরবর্তী নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত শক্তি বিপুল জয় পায় এবং মোহাম্মদ মুরসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংস্কারের অভাবের কারণে ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ফলে বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা খুব অল্প সময়েই ভেঙে পড়ে।
ইউক্রেন: কমলা বিপ্লবের দীর্ঘ ছায়া
২০০৪ সালের ‘কমলা বিপ্লব’ নির্বাচনী জালিয়াতির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন হিসেবে শুরু হয়। ব্যাপক বিক্ষোভের ফলে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ভিক্তর ইউশশেঙ্কো বিজয়ী হন।
এই আন্দোলন ইউক্রেনকে ইউরোপমুখী রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। তবে এর ফলে রাশিয়া ও ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও দেশটি বহন করছে।
জর্জিয়া: গোলাপ বিপ্লবের দ্বৈত বাস্তবতা
২০০৩ সালের ‘গোলাপ বিপ্লব’ ছিল এক রক্তপাতহীন গণআন্দোলন। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে জনগণ বিক্ষোভে নামে এবং মিখেইল সাকাশভিলি ক্ষমতায় আসেন।
২০০৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও তার শাসনকালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে সমালোচনা ওঠে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিপ্লব-পরবর্তী নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্র
| দেশ | বিপ্লবের সময় | নির্বাচনের ফলাফল | পরিণতি |
|---|---|---|---|
| শ্রীলঙ্কা | ২০২২ | বামপন্থি নেতৃত্বের জয় | তুলনামূলক স্থিতিশীলতা |
| তিউনিসিয়া | ২০১১ | অবাধ নির্বাচন | রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত |
| মিশর | ২০১১ | গণতান্ত্রিক সরকার | সেনা অভ্যুত্থানে পতন |
| ইউক্রেন | ২০০৪ | পুনর্নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব | ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি |
| জর্জিয়া | ২০০৩ | বিপুল ভোটে নতুন সরকার | মিশ্র প্রতিক্রিয়া, আংশিক অস্থিরতা |
উপসংহার
এই পাঁচ দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব হলেও স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। নির্বাচন কেবল একটি ধাপ; এর পর প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সংস্কার এবং জনগণের আস্থা অর্জন। অন্যথায় বিপ্লবের অর্জন দ্রুতই ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে।
