তারাবির মাসে বাজারে ক্যারাম ও টিভি নিষিদ্ধের নির্দেশ

কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি বাজারে পবিত্র রমজান মাসে ক্যারাম খেলা ও টেলিভিশন চালানো বন্ধ রাখতে এক পুলিশ কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। একদিকে ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে এই পদক্ষেপকে কেউ কেউ সমর্থন করলেও, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিনোদনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল ভিডিওর তথ্য

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০ ডিসেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আমির হামজা স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে পাটিকাবাড়ি বাজার পরিদর্শনে যান। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানার অন্তর্গত পাটিকাবাড়ি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মসিউল আজম। যদিও তিনি ওই সময় সাদাপোশাকে ছিলেন, তবুও একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার নির্দেশ প্রদানের ভঙ্গিটি ছিল বেশ কঠোর।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যাম্প ইনচার্জ মসিউল আজম একটি চায়ের দোকানে ক্যারাম খেলা চলতে দেখে দোকানির দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধমকের সুরে বলেন:

“তারাবির এক মাস কোনো ক্যারাম, কোনো টিভি চলবে না। আমি সেদিন বাজার কমিটিকে ডেকে বলে গেছি না? কেন চলল? দেব বসান?”

ভিডিওতে তার এই নির্দেশের সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ সদস্য আমির হামজাকে অনেকটা নমনীয় সুরে বলতে শোনা যায় যে, রমজান মাস ইবাদতের সময়, তাই নামাজের সময় যেন এসব কার্যক্রম না চালানো হয়।


প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

এই নির্দেশনার বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মসিউল আজম দাবি করেছেন যে, তিনি ইসলামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এবং ‘ওপর মহলের’ নির্দেশে এমন কথা বলেছেন। তবে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি মাসুদ রানা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) জসিম উদ্দিন স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যারাম বা টিভি বন্ধের এমন কোনো দাপ্তরিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট পক্ষপদবি/অবস্থানদেওয়া বক্তব্য/অবস্থান
মসিউল আজমক্যাম্প ইনচার্জ (ইবি থানা)ধর্মীয় সম্মানের খাতিরে ওপর মহলের নির্দেশে এটি বন্ধের কথা বলেছেন।
মাসুদ রানাওসি (ইবি থানা)পুলিশ বিভাগ থেকে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
জসিম উদ্দিনপুলিশ সুপার, কুষ্টিয়াএটি কোনো আইনি বিষয় নয়, রোজার দিনে দোকান খোলা রাখা অনুভূতির বিষয়।
কাশেমইউপি সদস্যবিনোদন বন্ধ করা ঠিক নয়, তবে জুয়া বা টাকা দিয়ে খেলা অনুচিত।

জনজীবন ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পরদিন সরেজমিনে পাটিকাবাড়ি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশের ভয়ে অধিকাংশ দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি চায়ের দোকান খোলা থাকলেও সেখানে ক্যারাম খেলা পুরোপুরি বন্ধ। দোকানদাররা কথা বলতে অনিহা প্রকাশ করলেও তাদের চোখেমুখে এক ধরণের আতঙ্ক লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গ্রামে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম এই চায়ের দোকানগুলো। সেখানে হঠাৎ এমন বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়ায় তরুণ সমাজের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই বিতর্ক তুঙ্গে। অনেকেই বলছেন, ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়; জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শন করে এটি নিশ্চিত করা পুলিশের কাজ নয়। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রচলিত আইনে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিনোদন হিসেবে ক্যারাম খেলা বা টিভি দেখার ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, যদি না সেখানে জুয়া বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করা উচিত, তবে সেটির জন্য কাউকে আইনবহির্ভূতভাবে চাপ দেওয়া বা শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কোনো কর্মকর্তার নেই।