ঝিনাইদহে পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ছবি ও পুষ্পমাল্য

ঝিনাইদহ শহরের শিল্পকলা একাডেমির সন্নিকটে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের ভস্মীভূত ও পরিত্যক্ত কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো ও পুষ্পমাল্য অর্পণের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে জনশূন্য ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই কার্যালয়ে হঠাৎ করে ছবি ও মালার উপস্থিতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।


ঘটনার বিবরণ ও নেতাকর্মীদের দাবি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তবে গত ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে একদল নেতাকর্মী সংগোপনে ওই কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। ঝিনাইদহ পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি অমিয় মজুমদার গণমাধ্যমকে জানান যে, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

তার দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘ কয়েক মাস পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কিছু নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে ভাঙাচোরা দেয়ালের একটি অংশে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি স্থাপন করেন এবং সেখানে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ছবিটিতে দেখা যায়, ধূলিমলিন ও পোড়া দেয়ালের মাঝে এই ছবিগুলো বিশেষভাবে দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ছবির প্রচারকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর ও বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।


কার্যালয়টির বর্তমান অবস্থা ও পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের এই কার্যালয়টি বারবার হামলার শিকার হয়। ৪ আগস্ট আন্দোলনকারীদের দেওয়া আগুনে ভবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরদিন ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা ও দুর্বৃত্তরা পুনরায় সেখানে ভাঙচুর চালায়। ভবনের এসি, আসবাবপত্র, কম্পিউটারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর এমনকি দরজা-জানালার কপাটগুলোও খুলে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কারহীন পড়ে থাকায় ভবনটি একপর্যায়ে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল।

ঘটনার পর্যায়সময়কালকার্যালয়ের অবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি
অগ্নিসংযোগ৪ আগস্ট ২০২৪আন্দোলন চলাকালে ভবনের আসবাবপত্রে আগুন ও ব্যাপক ধোঁয়া।
লুটপাট ও ধ্বংস৫ আগস্ট ২০২৪সরকার পতনের পর আসবাবপত্র, এসি ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য লুট।
পরিত্যক্ত অবস্থাসেপ্টেম্বর – জানুয়ারিদরজা-জানালাহীন কাঠামো, আবর্জনা ও অসামাজিক কাজের কেন্দ্র।
ছবি ও পুষ্পস্তবক২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬সংগোপনে ছবি টাঙানো ও স্থানীয় নেতাদের ফটোশুট।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

পরিত্যক্ত এই কার্যালয়ে হঠাৎ করে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান ও দলীয় প্রধানের ছবি টাঙানোর ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। কেউ কেউ একে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, সাধারণ জনগণের একটি অংশের মতে, যে কার্যালয়টি দীর্ঘদিন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, সেখানে এ ধরনের কার্যক্রম জনমনে আতঙ্ক বা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। কোনো প্রকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যেন না ঘটে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী একে একটি “সাহসী পদক্ষেপ” হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলেও, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জনসমক্ষে কেউ বড় কোনো জমায়েত বা কর্মসূচি পালন করেনি।

পরিশেষে বলা যায়, একটি বিধ্বস্ত দেয়ালের ওপর টাঙানো এই ছবিগুলো কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডই নয়, বরং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও টিকে থাকার লড়াইয়ের একটি চিত্র হিসেবেও প্রতিভাত হচ্ছে।