স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এমপি ও মন্ত্রী পেল দাগনভূঞা

দীর্ঘ ৫৪ বছরের রাজনৈতিক প্রতীক্ষা, হাহাকার এবং জনআকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফেনীর দাগনভূঞাবাসী অবশেষে তাদের নিজেদের ভূমি থেকে সংসদ সদস্য ও পূর্ণমন্ত্রী পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত নতুন সরকারে দাগনভূঞার কৃতি সন্তান এবং প্রথিতযশা ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে এই জনপদ থেকে কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে যে উন্নয়ন বৈষম্যের ক্ষোভ ছিল, এই বিজয়ের মাধ্যমে তার ইতি ঘটল।


নির্বাচনী ফলাফল ও বিজয় গাথা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তিনি ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক পান ১ লাখ ৮ হাজার ১৬৩ ভোট। প্রায় ৪৯ হাজার ২৬২ ভোটের ব্যবধানে এই ঐতিহাসিক বিজয় দাগনভূঞার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।

একনজরে ফেনী-৩ আসনের নির্বাচনী পরিসংখ্যান:

বিষয়বিবরণ
বিজয়ী প্রার্থীআবদুল আউয়াল মিন্টু (বিএনপি)
প্রাপ্ত ভোট১,৫৭,৪২৫
নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীডা. মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক (জামায়াত)
ভোটের ব্যবধান৪৯,২৬২
মোট ভোটার৫,০৩,০৮৭ জন
দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বৈষম্যের অবসান

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ফেনী-৩ আসনে বিজয়ী প্রার্থীরা মূলত সোনাগাজী বা ফেনী সদর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিন্যাসের কারণে দাগনভূঞা উপজেলা সবসময়ই প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, এই আসন থেকে এর আগে আওয়ামী লীগ ৪ বার, বিএনপি ৩ বার এবং জাতীয় পার্টি ২ বার জয়লাভ করলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দাগনভূঞার স্থানীয় ছিলেন না। এবারই প্রথম নিজেদের সন্তানকে সংসদ সদস্য এবং একই সাথে ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন’ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পাওয়ায় পুরো উপজেলায় আনন্দের বন্যা বইছে।

নেতৃত্বের প্রোফাইল ও পারিবারিক ঐতিহ্য

আবদুল আউয়াল মিন্টু কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় অভিভাবক। তিনি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই-এর দুইবারের সফল সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

মিন্টুর পরিবারও স্থানীয় রাজনীতি ও জনসেবায় দীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী। তাঁর বাবা প্রয়াত হাজী সফি উল্যাহ দাগনভূঞা উপজেলার দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তাঁর ভাই আকবর হোসেন দাগনভূঞা পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল নারী উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন ‘ওয়েব’-এর চেয়ারপারসন এবং বড় ছেলে তাবিথ আউয়াল বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

উচ্ছ্বাস ও আগামীর প্রত্যাশা

বিজয় ঘোষণার পর থেকেই দাগনভূঞা উপজেলা ছাত্রদল ও যুবদলের উদ্যোগে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ কর্মসূচি চলছে। জামশেদুর রহমান ফটিকের নেতৃত্বে আয়োজিত এসব মিছিলে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, নবনিযুক্ত মন্ত্রী অবহেলিত দাগনভূঞার অবকাঠামোগত উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। বিশেষ করে উপজেলার উত্তরাঞ্চলে নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রাস্তাঘাটের আধুনিকায়নে তিনি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন।

দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন জানান, “আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যই হলো জনসেবা। দীর্ঘদিন এই আসনটি উন্নয়নের দিক থেকে বৈষম্যের শিকার ছিল। আবদুল আউয়াল মিন্টুর হাত ধরে সেই বঞ্চনার অবসান ঘটবে এবং আধুনিক দাগনভূঞা গড়ে উঠবে।”