ভালোবাসা দিবস যখন বিশ্বজুড়ে মানুষ একে অপরের প্রতি প্রেম ও মমতা প্রকাশের উৎসবে মেতেছিল, ঠিক তখনই ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের বাহাদুরগড়ে ঘটে গেছে এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) স্বামী আনশুল ধাওয়ান তাঁর স্ত্রী মহককে নৃশংসভাবে হত্যা করে ভালোবাসা দিবসকে রক্তরঞ্জিত করেছেন। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ডাকাত দলের হামলার নাটক সাজালেও শেষ রক্ষা হয়নি; পুলিশের তীক্ষ্ণ তদন্তে মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে আসে মূল রহস্য।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সাজানো নাটক
গত রোববার রাতে বাহাদুগড় এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে খুন করেন আনশুল। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ওই দিন রাত ১১টার দিকে তিনি নিজেই পুলিশকে ফোন করেন। অত্যন্ত আতঙ্কিত হওয়ার অভিনয় করে তিনি দাবি করেন যে, একদল অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারী তাদের বাড়িতে লুটপাটের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছিল। তিনি জানান, ডাকাতরা তাকে মারধর করে বেঁধে রাখে এবং তাঁর স্ত্রীর গলা কেটে পালিয়ে যায়।
খবর পেয়ে ঝাজ্জর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এইচডিএফসি ব্যাংকের কর্মী মহকের নিথর দেহ রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে এটিকে দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও খুনের ঘটনা বলে মনে করা হলেও তদন্ত কর্মকর্তাদের মনে কিছু খটকা তৈরি হয়।
তদন্তের মোড় ও পুলিশের হাতে ধরা পড়া
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আনশুলের দেওয়া তথ্যের মধ্যে একের পর এক অসংগতি ধরা পড়তে থাকে। একজন উচ্চশিক্ষিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়েও তিনি হামলাকারীদের শারীরিক গঠন বা পালানোর রাস্তা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছিলেন না। এছাড়া ঘরের আলমারি বা আসবাবপত্র ডাকাতির লক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
নিচে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সংক্রান্ত তথ্যের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| ভিকটিম | মহক (ব্যাংক কর্মকর্তা, এইচডিএফসি) |
| অভিযুক্ত স্বামী | আনশুল ধাওয়ান (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) |
| হত্যাকাণ্ডের সময় | ভালোবাসা দিবসের রাত (১৪ ফেব্রুয়ারি) |
| দাবিকৃত কারণ | সন্দেহ ও দাম্পত্য কলহ |
| তদন্তকাল | ১৮ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উন্মোচন |
| অপরাধের ধরন | পরিকল্পিত হত্যা ও মিথ্যা তথ্য প্রদান |
হত্যার নেপথ্যে ছিল গভীর সন্দেহ
পুলিশি জেরার মুখে একপর্যায়ে আনশুল ভেঙে পড়েন এবং স্বীকার করেন যে তিনিই তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, আনশুল তাঁর স্ত্রী মহকের চারিত্রিক সততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দিহান ছিলেন। বিশেষ করে ব্যাংকে দীর্ঘ সময় কাজ করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা নিয়ে তাদের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া হতো।
ভালোবাসা দিবসের দিনটি তারা বাইরে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করেন এবং একসাথে নৈশভোজও সারেন। কিন্তু ঘরে ফেরার পর পুরনো সেই সন্দেহ ও তিক্ততা পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের এক পর্যায়ে আনশুল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্ত্রীর গলা কেটে ফেলেন।
বিচার বিভাগীয় পদক্ষেপ
ঝাজ্জর পুলিশের এসপি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত আনশুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার করা হয়েছে। ধুর্ত এই অপরাধী ডাকাতির গল্প সাজিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার যে অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর সাজার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। উচ্চশিক্ষিত এক দম্পতির এমন করুণ পরিণতি স্থানীয় সমাজে স্তব্ধতা ও শোকের ছায়া ফেলেছে।
পারিবারিক কলহ এবং অন্ধ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে একজন জীবনসঙ্গী কতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারেন, এই ঘটনাটি তারই এক ভয়াবহ প্রমাণ। পুলিশ বর্তমানে মামলাটির চার্জশিট গঠনের কাজ সম্পন্ন করছে।
