অজেয় রুপনার ঐতিহাসিক ক্লিন শিট

একজন ফুটবলারের জন্য পুরো মৌসুম অপরাজিত থাকা যেমন গৌরবের, একজন গোলরক্ষকের জন্য পুরো লিগে একটিও গোল না খাওয়া তার চেয়েও কঠিন ও বিরল কৃতিত্ব। সেই অসাধারণ অর্জনই গড়ে নতুন ইতিহাস লিখেছেন বাংলাদেশের এক নম্বর নারী গোলকিপার রুপনা চাকমা। সদ্য সমাপ্ত নারী ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী স্টারসের জার্সিতে ৯টি ম্যাচ খেলে একটি গোলও হজম করেননি তিনি। এই অনন্য সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন লিগের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার।

কমলাপুর স্টেডিয়ামে শেষ হওয়া এবারের লিগে রাজশাহী স্টারস ছিল একেবারেই অপ্রতিরোধ্য। ১০ ম্যাচে ৯০ গোল করে কোনো গোল না খাওয়ার বিরল নজির গড়েছে দলটি। রুপনা খেলেছেন ৯ ম্যাচে; দুর্বল প্রতিপক্ষ কাচারিপাড়ার বিপক্ষে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়, সেই ম্যাচে দায়িত্ব সামলান জাতীয় দলের দ্বিতীয় গোলকিপার স্বর্ণা রানী মন্ডল। আরও দু-একটি ম্যাচে শেষ দিকে রুপনাকে তুলে অন্যদের সুযোগ দিয়েছে কোচিং স্টাফ। তবু মূল লড়াইয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পোস্টের নিচে ছিলেন তিনি—দৃঢ়, স্থির এবং আত্মবিশ্বাসী।

লিগে রাজশাহী স্টারসের সারসংক্ষেপ

সূচকপরিসংখ্যান
মোট ম্যাচ১০
জয়১০
মোট গোল৯০
হজম করা গোল
রুপনার খেলা ম্যাচ
রুপনার হজম করা গোল
রুপনার সেভ করা পেনাল্টি

লিগজুড়ে রুপনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ফরাশগঞ্জ ও সেনাবাহিনী। ফরাশগঞ্জের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের ম্যাচে কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন তিনি। সেনাবাহিনীর বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে জয় পেলেও রুপনার সতর্কতা ও পজিশনিং ছিল প্রশংসনীয়। পুরো লিগে তাঁর বিরুদ্ধে একটি পেনাল্টি হয়েছিল—সেটিও ঠেকিয়ে দেন দৃঢ় হাতে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চেও রুপনার ধারাবাহিকতা চোখে পড়ার মতো।সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ-এর ২০২২ আসরে ৫ ম্যাচে মাত্র ১ গোল এবং ২০২৪ সালে ৫ ম্যাচে ৪ গোল হজম করে তিনি জিতেছেন সেরা গোলকিপারের পুরস্কার। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর অবস্থান তাই প্রশ্নাতীত।

রাঙামাটির কুতুকছড়ির সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া রুপনার জীবনপথ সহজ ছিল না। জন্মের আগেই হারিয়েছেন কৃষক বাবা গাজামনি চাকমাকে। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রুপনা বড় হয়েছেন নানা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। গ্রামের ঘাগড়া স্কুলে শান্তিমনি চাকমার হাত ধরে ফুটবলে হাতেখড়ি। শুরুটা ছিল স্ট্রাইকার হিসেবে; পরে কোচের পরামর্শে গোলকিপার হওয়ার সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর ভাগ্য।

২০২২ সালে সাফ জয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে একটি বাড়ি পেয়েছিলেন তিনি—যা তাঁর জীবনের সংগ্রামের এক প্রতীকী স্বীকৃতি। গত বছর ভুটানের লিগে ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের হয়ে খেলেও আস্থার প্রতীক ছিলেন রুপনা। এখন তাঁর স্বপ্ন আরও বড়—এশিয়ার শক্তিশালী কোনো লিগে নিজেকে প্রমাণ করা।

আগামী ২০ বা ২১ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান কাপে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী দল। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরাশক্তির বিপক্ষে লড়াই সহজ হবে না। তবে রুপনার কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়, “আমি প্রস্তুত। চেষ্টা করব নিজের সেরাটা দিতে।” পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তাঁর এই আত্মবিশ্বাসই আজ বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় ভরসা।