মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম বিন্দুতে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির দেওয়া এক কড়া হুঁশিয়ারি বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত হানে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হবে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু। এই সংঘাতের দামামা এমন এক সময়ে বাজছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।
Table of Contents
মার্কিন রণতরী বনাম ইরানের ব্যালিস্টিক শক্তি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে তিনি ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তেহরান একে স্রেফ উস্কানি হিসেবে দেখছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি দাবি করেছেন, ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো আক্রমণ হলে তারা বসে থাকবে না। আমেরিকার মূল ভূখণ্ড দূরে হলেও আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলো যে ইরানের নিখুঁত নিশানার আওতায় রয়েছে, তা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় দুই হাজার মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রধান প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করছে।
মিসাইল রেঞ্জের আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিসমূহ
ইরানের হাতে থাকা ‘খুররমশাহর’ এবং ‘সেজজিল’-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির মিসাইলগুলো প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে অবস্থিত মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোগুলো এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
ইরানের মিসাইল রেঞ্জের আওতায় থাকা প্রধান মার্কিন ঘাঁটিগুলো একনজরে:
| ঘাঁটির নাম | অবস্থান | গুরুত্ব |
| আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি | কাতার | মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমান ঘাঁটি। |
| পঞ্চম নৌবহর সদর দপ্তর | বাহরাইন | পারস্য উপসাগরে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র। |
| আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি | সংযুক্ত আরব আমিরাত | আকাশ প্রতিরক্ষা ও নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। |
| ইনজিলিক বিমান ঘাঁটি | তুরস্ক | কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন। |
| ক্যাম্প আরিফজান | কুয়েত | মার্কিন সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব। |
| আল আসাদ বিমান ঘাঁটি | ইরাক | মার্কিন ও কোয়ালিশন বাহিনীর প্রধান অবস্থান। |
পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের এই হুমকিকে স্রেফ বাগাড়ম্বর হিসেবে দেখছে না ওয়াশিংটন। পেন্টাগন ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র দেশে ‘থাড’ (THAAD) এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। জর্ডান, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে বাড়তি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান গত বছর ইসরায়েলে প্রায় ৫০০ মিসাইল হামলা চালিয়ে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। যদিও সেই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত ছিল, কিন্তু হাজার হাজার মিসাইল একসাথে নিক্ষেপ করার ক্ষমতা (Saturation Attack) যেকোনো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনা বনাম আপসহীন অবস্থান
এত উত্তেজনার মাঝেও ওমানে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের (প্রক্সি গোষ্ঠী) সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার বিষয়ে কোনো চাপ তারা মেনে নেবেন না। কারণ তেহরান একে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের কঠোর সামরিক বার্তা এবং ইরানের ‘ট্রিগারে আঙুল রাখা’র নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক পথে সমাধান না এলে এই অস্থিরতা যেকোনো সময় একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও।
