কানাডার টরন্টোতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাফওয়ান জাহিদের (২৫) আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং তার নিজ জন্মভূমিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় টরন্টোতে অবস্থিত নিজ অ্যাপার্টমেন্টে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সাফওয়ান জাহিদ দেশের স্বনামধন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা (সিবিও) ডা. জাহিদ হোসেন এবং কানিতা রহমানের একমাত্র পুত্র।
এক অনন্য মেধার অকাল বিদায়
মোহাম্মদ সাফওয়ান জাহিদ কেবল একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলেন না; বরং বিদেশের মাটিতে তিনি বাংলাদেশের মেধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো-তে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এমবিএ এবং এমএ ডিগ্রির শেষ টার্মে অধ্যয়ন করছিলেন। তার একাডেমিক পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত চমৎকার, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন ল্যাব’-এর স্কলার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সাফওয়ানের কর্মমুখী মেধা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিতি দিয়েছিল। তিনি টরন্টোভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) স্টার্টআপ ‘ম্যাট্রা’ (MATRA)-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার ও নিরাপত্তার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি কানাডা সরকারের ‘সেইফ এআই’ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় শোয়ার্টজ রেইসম্যান ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন।
শেষ বিদায় ও শোকের পরিবেশ
সাফওয়ান জাহিদের মৃত্যুতে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ডিন ও শিক্ষক মণ্ডলী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে একজন ‘ব্যতিক্রমী মেধাবী ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। গত শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে জুমার নামাজের পর টরন্টোর বিখ্যাত বায়তুল আমান মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা অংশগ্রহণ করেন।
সাফওয়ান জাহিদের সংক্ষিপ্ত জীবন ও অর্জনসমূহ:
| বিষয় | তথ্য |
| নাম | মোহাম্মদ সাফওয়ান জাহিদ (২৫) |
| শিক্ষা | ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো (এমবিএ ও এমএ) |
| উদ্যোক্তা উদ্যোগ | প্রতিষ্ঠাতা, ম্যাট্রা (MATRA) – এআই স্টার্টআপ |
| পেশাগত ভূমিকা | উপদেষ্টা, ‘সেইফ এআই’ নীতিনির্ধারণ (কানাডা সরকার) |
| বিশেষ অর্জন | স্কলার, ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন ল্যাব |
| পারিবারিক পরিচয় | একমাত্র পুত্র, ডা. জাহিদ হোসেন (ডিএমডি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক) |
প্রবাসী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সাফওয়ানের এই অকাল মৃত্যু কানাডায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবারের মাঝে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ডা. জাহিদ হোসেনের সাবেক সহকর্মী ব্যাংকার রুনা লায়লা শোকসন্তপ্ত চিত্তে জানান, শৈশব থেকেই সাফওয়ান ছিলেন শান্ত ও প্রখর মেধাসম্পন্ন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে কানাডায় যাওয়া অন্তত ২৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন। এই প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রবাসে একাকিত্বের মতো বিষয়গুলোকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
সাফওয়ান জাহিদের মতো একজন সম্ভাবনাময় তরুণের চলে যাওয়া শুধুমাত্র তার পরিবারের জন্য নয়, বরং দেশের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার এই মেধা ও কর্মস্পৃহা প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
