স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ে বড় পরিবর্তন: ক্রেডিট কার্ড ও ২৫ বছর বয়সসীমা

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের আধুনিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগ (Financial Inclusion Department) সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ নীতিমালা ঘোষণা করেছে। এই নতুন নির্দেশনার ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং লেনদেনের পরিধি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি আর্থিক সক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

বয়সসীমা ও নামকরণে পরিবর্তন

এতদিন প্রচলিত নিয়মে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা ‘স্কুল ব্যাংকিং’ হিসাব খুলতে পারত। নতুন নীতিমালায় এর নামকরণ পরিবর্তন করে করা হয়েছে ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে বয়সসীমার ক্ষেত্রে; এখন থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের পরিবর্তে অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সী যেকোনো শিক্ষার্থী এই হিসাব খুলতে ও পরিচালনা করতে পারবেন। অর্থাৎ স্কুল ও কলেজ ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বড় একটি অংশ এখন থেকে এই বিশেষায়িত ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আসবে।

নতুন নীতিমালার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

শিক্ষার্থীদের আর্থিক স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরির লক্ষ্যে ক্রেডিট কার্ডের মতো আধুনিক সুবিধা এই প্রথম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র ডেবিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ পেতেন, যা এখন থেকে ক্রেডিট কার্ডেও উন্নীত করা সম্ভব হবে। এছাড়া এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের সীমা এবং মাসিক জমার পরিমাণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছে।

স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ের নতুন ও পুরাতন নিয়মের তুলনামূলক চিত্র:

বিষয়ের বিবরণপূর্ববর্তী নিয়ম (স্কুল ব্যাংকিং)বর্তমান নিয়ম (স্টুডেন্ট ব্যাংকিং)
সর্বোচ্চ বয়সসীমা১৮ বছর পর্যন্ত২৫ বছর পর্যন্ত
কার্ড সুবিধাশুধুমাত্র ডেবিট কার্ডডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড উভয়ই
মাসিক উত্তোলন সীমা (এটিএম)৫,০০০ টাকা১৫,০০০ টাকা (আবেদনে ২৫,০০০ পর্যন্ত)
মাসিক সর্বোচ্চ জমাতথ্য নেই/সীমিত২৫,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ স্থিতি (ব্যালেন্স)তথ্য নেই/সীমিত৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা
ঋণের সুবিধাছিল নাশিক্ষা উপকরণের জন্য বিশেষ ঋণ

উচ্চশিক্ষা ও বিদেশ যাত্রায় বিশেষ সুবিধা

নতুন এই নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশে উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থীদের সহায়তা। যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য এখন আলাদা করে কোনো ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ বা বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন পড়বে না; এই স্টুডেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টটিই তারা বিদেশে ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া বৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সও এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রহণ ও স্থানান্তর করা যাবে।

শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের সুবিধার্থে অভিভাবকের জামানতে ঋণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, শিক্ষার্থীদের প্রদান করা ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার কোনোভাবেই ৭ শতাংশের বেশি হবে না, যা সাধারণ ঋণের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের বিশাল ছাত্র সমাজকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এতে করে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মাঝে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়বে, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার প্রসারের মাধ্যমে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। এই সংস্কারের ফলে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি তরুণরা অর্থনৈতিকভাবে আরও সচেতন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।