যৌন কেলেঙ্কারি ও মানবপাচারের দায়ে অভিযুক্ত প্রয়াত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক থামার লক্ষণ নেই। মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি এপস্টিন সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার ই-মেইল ও চিঠিপত্র প্রকাশ করার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই নথিতে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বিল গেটসের মতো পরিচিত নামের বাইরেও এমন কিছু বিশ্বনেতা ও ব্যক্তিত্বের নাম উঠে এসেছে, যা অনেককেই বিস্মিত করেছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সাক্ষাতের প্রমাণ নেই, তবুও এপস্টিনের প্রভাববলয় ও যোগাযোগের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল, তা এই নথিগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
নথিতে আলোচিত বিশ্বনেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব
নতুন নথিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে নথিতে নাম থাকা মানেই তারা অপরাধী নন; অনেক ক্ষেত্রে এপস্টিন নিজেই এই ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছেন বা ই-মেইলে তাঁদের কথা উল্লেখ করেছেন।
নথিতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা:
| ব্যক্তির নাম | পদবী/পরিচয় | নথিতে প্রাপ্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ |
| ভ্লাদিমির পুতিন | প্রেসিডেন্ট, রাশিয়া | ১,০০৫ বার নাম এসেছে; অধিকাংশ সংবাদ ক্লিপিং। এপস্টিন তাঁর সাথে সাক্ষাতের তোড়জোড় করেছিলেন। |
| দালাই লামা | তিব্বতি ধর্মীয় নেতা | ১৬৯ বার নাম এসেছে। তবে তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, এপস্টিনের সঙ্গে কখনো কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। |
| নোম চমস্কি | প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ | ২০১৯ সালে এপস্টিন তাঁর কাছে পরামর্শ চেয়ে ই-মেইল করেন। একাডেমিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। |
| অনিল আম্বানি | ভারতীয় শিল্পপতি | ২০১৭-২০১৯ পর্যন্ত নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান। ব্যবসা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনার তথ্য রয়েছে। |
| দীপক চোপড়া | লেখক ও আধ্যাত্মিক বক্তা | ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগে পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। মামলার খোঁজখবর ও ব্যক্তিগত অনুরোধের তথ্য রয়েছে। |
ভ্লাদিমির পুতিন ও দালাই লামা প্রসঙ্গ
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম এপস্টিন নথিতে ১,০০৫ বার আসলেও এর কোনোটিতেই তাঁদের সরাসরি সাক্ষাতের প্রমাণ মেলেনি। প্রাপ্ত ই-মেইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপস্টিন রাশিয়ার শীর্ষ মহলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য প্রবল চেষ্টা চালিয়েছিলেন। অন্যদিকে, দালাই লামার নাম ১৬৯ বার আসায় বিশ্বজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে তাঁর কার্যালয় এক জোরালো বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যগুলোকে তারা বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছে।
বুদ্ধিজীবী ও শিল্পপতিদের সংশ্লিষ্টতা
তাত্ত্বিক ভাষাবিদ নোম চমস্কির সাথে এপস্টিনের যোগাযোগের বিষয়টি বেশ আলোড়ন তুলেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টিন যখন যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে কোণঠাসা ছিলেন, তখন তিনি চমস্কির কাছে সহমর্মিতা ও পরামর্শ চেয়েছিলেন। এমনকি চমস্কি এপস্টিনের প্রতি হওয়া আচরণকে ‘ভয়াবহ’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
ভারতীয় শিল্পপতি অনিল আম্বানির বিষয়টিও নথিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তাঁদের মাঝে বিনিময় হওয়া বার্তায় কেবল ব্যবসা নয়, বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ের নানা চাহিদার কথা উঠে এসেছে। একইভাবে আধ্যাত্মিক বক্তা দীপক চোপড়ার সঙ্গে এপস্টিনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ২০১৬ সালের এক বার্তায় দীপক চোপড়াকে এপস্টিনের একটি দেওয়ানি মামলার খোঁজ নিতে দেখা যায়, যা তাঁদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
জেফরি এপস্টিন নথির এই নতুন প্রকাশনা প্রমাণ করে যে, এই কুখ্যাত ধনকুবের নিজের ক্ষমতার জাল বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রভাবশালী স্তরেই বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যদিও অভিযুক্তদের অনেকেই দাবি করছেন তাঁরা নির্দোষ, তবুও এসব নথির স্বচ্ছতা ও গভীরতা বিশ্ব রাজনীতির অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করে চলেছে।
