বৈধব্যের চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষকে দেখেছি নানান রঙে—কেউ মুখোশের আড়ালে, কেউ প্রকাশ্যেই। ক্ষমতা, দম্ভ, আত্মঅহংকার আর অমানবিকতার মুখোমুখি হতে হতে আজ স্পষ্ট মনে হয়—জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু সত্যিই ছিলেন হৃদয়বান, মানবিক এবং বড় মাপের একজন মানুষ। এই লেখা কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি এক নারীর চোখে দেখা ভালোবাসা, লড়াই, হারিয়ে যাওয়ার বেদনা এবং সমাজকে দেখার নতুন উপলব্ধি।
ভোর চারটার সেই মুহূর্তটি আজও স্পষ্ট। হাত ধরে বসে ছিলাম। শরীর নিস্তেজ, নিঃশ্বাস ভারী। ডাক্তার আইসিইউতে নেওয়ার কথা বললে বলেছিলাম—আর নয়, ওকে যেতে দিন। পনেরো মাস ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছি, তবু সেই বিদায় মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আঠারো বছরের স্মৃতি, স্বপ্ন, পরিকল্পনা—সব যেন এক নিমিষে থেমে গেল। শুধু শ্বাস নেওয়া আর ফেলা—এটাই তখন জীবনের সংজ্ঞা।
এই যাত্রার শুরু হয়েছিল ১০ নভেম্বর, টিংকুর জন্মদিনে। ধরা পড়ে মাথার টিউমার। কয়েক দিনের মধ্যেই সিঙ্গাপুরে অপারেশন, তারপর জানা গেল—গ্লাইওব্লাস্টোমা গ্রেড ফোর, সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ক্যান্সারের একটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষার ভার তখন আমাদের কাঁধে চেপে বসে। একদিকে অস্ত্রোপচার, অন্যদিকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি—আর আমাদের দুজনের মাঝখানে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। ও হাসতে চাইত, আমি শক্ত থাকতে চাইতাম—যেন ভেঙে পড়ার অবকাশ নেই।
চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে ছুটেছি—সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, আবার বাংলাদেশ। চিকিৎসকদের হিসাব বদলেছে, সময়ের পূর্বাভাস কমেছে, কিন্তু ভালোবাসার ঘাটতি হয়নি। বন্ধুদের উপস্থিতি, মানুষের সহমর্মিতা আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছিল। তবু ধীরে ধীরে শরীর হার মানতে শুরু করল—প্যারালাইসিস, কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির ক্ষয়। তখন টিংকু আর আমার কাছে স্বামী বা বন্ধু নয়—একটি অসহায় শিশুর মতো। খাইয়ে দেওয়া, গোসল করানো, চুল আঁচড়ানো—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের পবিত্র আনন্দ।
এই দীর্ঘ লড়াই আমাকে সমাজের আরেকটি রূপ দেখিয়েছে। হুইলচেয়ারে চলাচলের অপ্রতুলতা, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য অবকাঠামোর অনুপস্থিতি, বয়স ও অসুস্থতাকে ঘিরে অবহেলা—এসব প্রশ্ন আমাকে নাড়া দিয়েছে। আমরা কি কখনো বৃদ্ধ হব না? অসুস্থ মানুষের আনন্দ পাওয়ার অধিকার নেই?
শেষ দিনগুলো হাসপাতালের কক্ষে—নাকের রাইস টিউব, অক্সিজেন মাস্ক, নিরব অপেক্ষা। অবশেষে সব শেষ। সাদা শাড়ি পরা সেই সকাল, সন্তানের প্রশ্ন, গ্রামের পথে শেষ যাত্রা—সব মিলিয়ে এক নিঃসঙ্গ অথচ গভীর অভিজ্ঞতা। রাউজান, টিংকুর স্বপ্নের গ্রাম—সেখানে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, হারানোর লজ্জা কতটা ভারী।
তবু এই শোকের মধ্যেই মানুষের ভালোবাসা আমাকে আগলে রেখেছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, পেশাগত জীবনে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক—কিন্তু সেই মুহূর্তে পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল সম্পর্ক আর মানবিকতা।
নিচের সারণিতে টিংকুর চিকিৎসা ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| সময়কাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১০ নভেম্বর | মাথার টিউমার শনাক্ত |
| ১৩–১৬ নভেম্বর | সিঙ্গাপুরে প্রথম ও দ্বিতীয় অপারেশন |
| ফেব্রুয়ারি | কেমো ও রেডিওথেরাপি শেষে দেশে ফেরা |
| পরবর্তী মাসগুলো | যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ও পুনর্মূল্যায়ন |
| জুলাই–আগস্ট | অতিরিক্ত অপারেশন ও গামা সার্জারি |
| জানুয়ারি | চূড়ান্ত হাসপাতালে ভর্তি |
| ভোর ৪টা | চিরবিদায় |
আজও আমি খুঁজে ফিরি—ছাদে, উঠোনে, স্মৃতির অলিগলিতে। নাম না জানা কোনো দেশে সে কেমন আছে জানি না। জানি শুধু—ভালোবাসা কখনো মরে না, সে রয়ে যায় স্মৃতির ভেতর, নিঃশ্বাসের গভীরে।
লেখক: প্রয়াত জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর সহধর্মিণী
