প্রাচীন স্থাপত্যের বিস্ময় অনুরাধাপুরার জেতাভানারামায়া: ১৭০০ বছরের ইতিহাস

বিস্ময়কর স্থাপত্যের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিসরের পিরামিড। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার বুকেই লুকিয়ে আছে এমন এক স্থাপনা, যা প্রাচীন বিশ্বের প্রকৌশল বিদ্যায় পিরামিডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন রাজধানী অনুরাধাপুরার পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘জেতাভানারামায়া’ স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় ১ হাজার ৭০০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই শহরটি ইতিহাসের এক অনন্য ভাণ্ডার।

জেতাভানারামায়ার নির্মাণ ও উচ্চতার গৌরব

রাজা মহাসেনার হাত ধরে ৩০১ খ্রিষ্টাব্দে এই গম্বুজাকার স্মৃতিস্তম্ভ বা স্তূপটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। নির্মাণের সময় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০০ ফুট (১২০ মিটার), যা তৎকালীন বিশ্বে মানুষের তৈরি স্থাপনাগুলোর মধ্যে উচ্চতার দিক থেকে ছিল তৃতীয়। এর চেয়ে উঁচু স্থাপনা ছিল কেবল মিসরের গিজার মহাপ্রাচীন পিরামিডগুলো। সময়ের বিবর্তনে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে এর উচ্চতা ২৩৩ ফুট, যা এখনো পথচারীদের বিস্ময় জাগায়।

স্থাপত্যটির বিশালতা এবং গিজার পিরামিডের সাথে এর তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

বিশেষত্বজেতাভানারামায়া স্মৃতিস্তম্ভগিজার গ্রেট পিরামিড
নির্মাণকাল৩০১ খ্রিষ্টাব্দ (রাজা মহাসেনার আমল)আনুমানিক ২৫৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ
মূল উপাদানপোড়ামাটির ইটবিশাল পাথরের ব্লক
আদি উচ্চতা৪০০ ফুট৪৮১ ফুট
বর্তমান উচ্চতা২৩৩ ফুট৪৫০ ফুট
স্থাপত্যের ধরনস্তূপ বা গম্বুজাকার স্মৃতিস্তম্ভচতুষ্কোণ পিরামিড

ইটের তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম স্থাপনা

জেতাভানারামায়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর নির্মাণ উপকরণ। এটি বিশ্বের ইতিহাসে ইটের তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করতে প্রায় ৯ কোটি ৩৩ লাখ পোড়ামাটির ইট ব্যবহৃত হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ ইটের বিশালতা বোঝাতে গবেষকরা একটি চমৎকার উদাহরণ দেন—যদি এই ইটগুলো দিয়ে তিন ফুট উঁচু একটি দেয়াল তৈরি করা হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে পিটসবার্গ শহর পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে।

কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনূঢ়া মানাতুঙ্গার মতে, কোটি কোটি ইটের নিখুঁত গঠন এবং সেগুলোকে এমনভাবে স্থাপন করা যেন হাজার বছর ধরে তা টিকে থাকে, তা প্রাচীন শ্রীলঙ্কানদের অসামান্য প্রকৌশল দক্ষতার প্রমাণ দেয়। পাথরের চেয়ে ইট অনেক বেশি ক্ষয়প্রবণ হলেও জেতাভানারামায়া পিরামিডের মতোই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

মঠ জীবন ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

স্মৃতিস্তম্ভটি ঘিরে গড়ে উঠেছিল ‘জেতাভানা বিহার’ নামক একটি বিশাল বৌদ্ধ মঠ। জ্যেষ্ঠ প্রত্নতত্ত্ব কর্মকর্তা গোদামুনে পান্নাসেহার তথ্যমতে, এখানে একসময় প্রায় ২০০ জন সন্ন্যাসী বসবাস করতেন। মঠের ঘরগুলোর জানলা বা দরজা এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যেন সন্ন্যাসীরা চোখ মেললেই এই সুউচ্চ পবিত্র স্মৃতিস্তম্ভটি দেখতে পান। রাজা মহাসেনা এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদেরই নয়, বরং তাঁর ভারত অভিযানের সময় বন্দীদের এবং সাধারণ বৌদ্ধ অনুসারীদেরও যুক্ত করেছিলেন। এই নির্মাণকাজে শক্তিশালী হাতি ও বলদে টানা বিশাল গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

উপসংহার

জেতাভানারামায়া কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপত্য নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনুরাধাপুরা শহরটি ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্ম প্রসারের প্রথম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। জেতাভানারামায়ার পর শ্রীলঙ্কায় বা এশিয়ার অন্য কোথাও এত বিশাল গম্বুজাকার স্তম্ভ আর নির্মিত হয়নি। এটি কেবল শ্রীলঙ্কার নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার গর্ব হিসেবে আজও বিশ্বমঞ্চে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রচারের অভাব এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এটি পিরামিডের মতো বিশ্বব্যাপী পরিচিত না হলেও, এর ঐতিহাসিক ও প্রকৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।