জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকলেও এই বহুচর্চিত যৌন পাচার ও নির্যাতন কেলেঙ্কারির অভিঘাত এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন–সংক্রান্ত নতুন তথ্য, পুরোনো যোগাযোগের পুনরুত্থান এবং একের পর এক নৈতিক প্রশ্ন স্টারমারের নেতৃত্বকে গভীর সংকটে ফেলেছে। ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরে ও বাইরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব কার্যত অনিশ্চয়তার দোলাচলে পড়েছে।
আটলান্টিকের দুই পারে এই কেলেঙ্কারির প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট ভিন্নতা দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা এখনো পূর্ণ ন্যায়বিচারের দাবিতে সক্রিয় থাকলেও রাজনৈতিক পর্যায়ে বড় ধরনের জবাবদিহির নজির খুব কম। বিপরীতে যুক্তরাজ্যে গণমাধ্যম, সংসদ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এখানেই স্টারমারের দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাপ সামাল দিতে পারছেন, সেখানে স্টারমার লেবার পার্টির ভেতর থেকেই বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন।
এই কেলেঙ্কারির প্রভাব কেবল যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথি ও তথ্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর ফলে প্রভাবশালী রাজনীতিক, ধনকুবের ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। যুক্তরাজ্যে জনমত এতটাই উত্তপ্ত যে রাজা তৃতীয় চার্লস ইতোমধ্যে নিজের ভাই সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে রাজকীয় দায়িত্ব ও সম্মান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, যা রাজপরিবারের জন্যও এক বড় নৈতিক বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি তদন্তকারীরা ২০১৯ সালে কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করলেও, জনমনে সন্দেহ ও অসন্তোষ আজও কাটেনি। তবু বাস্তবতা হলো—এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও খুব কম মার্কিন রাজনীতিক বড় রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছেন। ব্যতিক্রম হিসেবে সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ল্যারি সামার্সের নাম আসে, যিনি ইমেইল প্রকাশের পর জনজীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং প্রকাশ্যে লজ্জা প্রকাশ করেন।
কিন্তু ব্রিটেনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কিয়ার স্টারমার স্বীকার করেন, সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্বের বিষয়টি জেনেও তিনি তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই স্বীকারোক্তিই আগুনে ঘি ঢালে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত নথিতে উঠে আসে, ২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং এমনকি বৈশ্বিক আর্থিক সংকটকালীন কিছু সংবেদনশীল তথ্য তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের জেরে ম্যান্ডেলসন পদত্যাগ করেন এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়।
স্টারমার সংসদে কঠোর ভাষায় বলেন, ম্যান্ডেলসন দেশ, সংসদ ও লেবার পার্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, মূল প্রশ্ন হলো—এই সম্পর্ক জেনেও কেন স্টারমার এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়াতেই লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের গুঞ্জন জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি ব্রিটিশ রাজনীতির আগে থেকেই চলমান কয়েকটি সংকটকে আরও তীব্র করেছে—নেতৃত্বের স্থায়িত্ব, নৈতিকতা ও গণমাধ্যমের চাপ। ভূমিধস জয় দিয়ে ক্ষমতায় আসা এক প্রধানমন্ত্রী দুই বছরের কম সময়েই কীভাবে এতটা দুর্বল অবস্থানে পৌঁছালেন, তা এখন ব্রিটিশ রাজনীতির বড় আলোচ্য বিষয়।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির প্রভাব: সংক্ষিপ্ত চিত্র
| ক্ষেত্র | যুক্তরাষ্ট্র | যুক্তরাজ্য |
|---|---|---|
| রাজনৈতিক জবাবদিহি | সীমিত | তুলনামূলকভাবে তীব্র |
| গণমাধ্যমের ভূমিকা | বিভক্ত | আগ্রাসী ও অনুসন্ধানী |
| বড় রাজনৈতিক মূল্য | বিরল | নেতৃত্ব সংকটে রূপ নিচ্ছে |
| জনমতের চাপ | স্থায়ী সন্দেহ | তীব্র জনরোষ |
সব মিলিয়ে, এপস্টেইন কাহিনি কেবল একটি অপরাধ কেলেঙ্কারি নয়; এটি ক্ষমতা, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক টিকে থাকার এক নির্মম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কিয়ার স্টারমার কতটা টিকে থাকতে পারবেন, তা নিয়েই এখন ব্রিটেনের রাজনীতি দুলছে।
