যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বর্তমান সংকটের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শাসনপদ্ধতিকে দায়ী করেছে। বুধবার প্রকাশিত ৫২৯ পৃষ্ঠার ‘বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২৬’-এ সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও মানুষের মৌলিক স্বাধীনতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন ও নতুন জোটের আহ্বান
প্রতিবেদনটির ৩৬তম সংস্করণে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ-এর নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, বর্তমান প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কর্তৃত্ববাদী মনোভাবকে রুখে দেওয়া। ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করছে এবং বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হানছে, তা মূলত চীন ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের নিয়ম ভাঙার প্রচেষ্টাকেই শক্তিশালী করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এইচআরডব্লিউ একটি কৌশলগত বৈশ্বিক জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই জোটে এমন সব গণতান্ত্রিক দেশ থাকবে যারা মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংস্থাটি মনে করে, সুপারপাওয়ারদের বিরোধিতা সত্ত্বেও যদি এই দেশগুলো একজোট হয়, তবে তারা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লক হিসেবে মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করতে পারবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রভাব
প্রতিবেদনে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতির কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অধিকার খর্ব করা, গর্ভপাত সেবায় বাধা দেওয়া, এবং ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের সুরক্ষা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। এছাড়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও গণমাধ্যমকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি সরকারের জবাবদিহিতা কমিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক সংহতিকে দুর্বল করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি থেকে সরে আসা বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে।
নিচে ট্রাম্পের নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন খাত ও বৈশ্বিক সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| ক্ষতিগ্রস্ত খাত/অঞ্চল | পরিস্থিতির বিবরণ ও প্রভাব |
| মানবাধিকার ও আইনি ব্যবস্থা | বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন। |
| সামাজিক সুরক্ষা | স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তার ভর্তুকি হ্রাস; নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব। |
| ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য | গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের প্রতি শর্তহীন সমর্থন; ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু। |
| ইউক্রেন সংকট | রাশিয়ার অপরাধকে উপেক্ষা করে ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড়তে ও পুতিনকে দায়মুক্তি দিতে চাপ প্রদান। |
| আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান | জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা। |
| সুদান ও দারফুর | মার্কিন নেতৃত্বের অভাবে সুদানে পুনরায় গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিনা বাধায় চলছে। |
মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ ও করণীয়
ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন যে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ (Responsibility to Protect) এর মতো আন্তর্জাতিক ধারণাগুলো এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা রুখতে নাগরিক সমাজ, ভোটার এবং মানবাধিকারকামী দেশগুলোকে একীভূত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সংস্থাটি মনে করে, কেবল সমন্বিত উদ্যোগই পারে সুপারপাওয়ারদের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
