ইরানে অস্থিরতার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ষড়যন্ত্র: খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশজুড়ে চলমান অস্থিরতা, বিক্ষোভ ও সহিংস ঘটনার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষায়, ইরানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের প্রতিফলন নয়; বরং এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অগ্রগতি ও সার্বভৌমত্বকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিদেশি শক্তির সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।

তেহরানে পুলিশ ক্যাডেটদের এক স্নাতক সমাবর্তনে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে খামেনি এই মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এ বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তিনি বলেন, ইরান আজ বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা, শিল্প ও কূটনীতিতে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য সহনীয় নয়। তাই তারা বিভিন্ন অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খামেনি ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে একটি হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ইরানের জনগণ গভীরভাবে শোকাহত হয়েছে এবং রাষ্ট্রও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। তবে তাঁর মতে, এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেভাবে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই ন্যায্য বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বহুদিন ধরেই ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ খুঁজছিল। মাহসা আমিনির মৃত্যুকে তারা একটি “ঢাল” হিসেবে ব্যবহার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং কিছু গোষ্ঠীকে সহিংসতায় উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভাষণ চলাকালে খামেনি দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বিক্ষোভের নামে যারা সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করছে, তারা প্রকৃতপক্ষে ইরানের শত্রুদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

খামেনির মতে, ইরানের সাধারণ জনগণ সবসময় জাতীয় সংহতি ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিদেশি চাপ ও ষড়যন্ত্রের মুখেও ইরান কখনো মাথানত করেনি। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, বর্তমান অস্থিরতাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে এবং দেশ তার উন্নয়নযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

পরিশেষে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যারা বিদেশের মদদে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, এই অস্থিরতা ইরানের উন্নয়ন, স্বাধিকার ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে না।

সাম্প্রতিক অস্থিরতা সংক্রান্ত মূল দিকসমূহ (সংক্ষেপে)

বিষয়খামেনির বক্তব্যের সারসংক্ষেপ
অস্থিরতার কারণযুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র
মাহসা আমিনির মৃত্যুদুঃখজনক ঘটনা, তবে সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য
বিক্ষোভের চরিত্রস্বতঃস্ফূর্ত নয়, বিদেশি উসকানিতে পরিচালিত
নিরাপত্তা বাহিনীদায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য প্রশংসিত
সরকারের অবস্থানবিদেশি হস্তক্ষেপ রোধে কঠোর পদক্ষেপ

এই বক্তব্যের মাধ্যমে খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরান বর্তমান সংকটকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বৃহত্তর চক্রান্তের অংশ হিসেবে দেখছে।