বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হান এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তাঁর সৃষ্টি শুধু সময়কে অতিক্রম করেনি, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবিকতা, প্রতিবাদ ও স্বপ্ন দেখার শক্তি জাগিয়ে তুলেছে। বহুলপঠিত উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ তাঁকে দিয়েছে চিরস্থায়ী পাঠকপ্রিয়তা। গ্রামীণ জনজীবনের অন্তর্গত সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা, আশা ও নীরব সংগ্রামের যে মমতাময় অথচ বাস্তব চিত্র তিনি এ উপন্যাসে এঁকেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজীর মজুপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া জহির রায়হানের জীবন ছিল স্বল্পায়ু, কিন্তু কর্মজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে উজ্জ্বল। সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—দুই অঙ্গনেই তিনি রেখে গেছেন স্থায়ী ছাপ। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সৃজনশীলতা ছিল শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা তাঁর সাহিত্যকর্মে বিশেষভাবে প্রতিফলিত। ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের বিখ্যাত লাইন—“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব”—বাংলার সংগ্রামী চেতনার এক অনির্বাণ প্রতীক। একইভাবে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। ‘বরফ গলা নদী’ ও ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’-তেও তিনি মানুষের অন্তর্লোক, ভালোবাসা ও সামাজিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরেছেন।
চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে জহির রায়হান ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তাঁর নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং রাজনৈতিক রূপকের মাধ্যমে নির্মিত এক ঐতিহাসিক দলিল। পারিবারিক কাহিনির আবরণে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের রূপক চিত্র তুলে ধরেন—যা আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। নায়ক রাজ্জাকের প্রথম ছবি ‘বেহুলা’ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন তারকার উত্থানের পথও তৈরি করেন। ববিতাসহ বহু শিল্পীর চলচ্চিত্রযাত্রার সূচনা তাঁর হাত ধরেই।
নিচে তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও সম্মাননার সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো:
| ক্ষেত্র | উল্লেখযোগ্য কাজ | মন্তব্য |
|---|---|---|
| উপন্যাস | হাজার বছর ধরে | গ্রামীণ জীবনের মহাকাব্যিক উপস্থাপন |
| উপন্যাস | আরেক ফাল্গুন | ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদায়ী চিত্র |
| উপন্যাস | বরফ গলা নদী | সামাজিক বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ |
| চলচ্চিত্র | জীবন থেকে নেয়া | রাজনৈতিক রূপকধর্মী ক্লাসিক |
| চলচ্চিত্র | কাঁচের দেয়াল | সামাজিক টানাপোড়েনের চিত্র |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭২) | মরণোত্তর |
| পুরস্কার | একুশে পদক (১৯৭৭) | মরণোত্তর |
| পুরস্কার | স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯২) | মরণোত্তর |
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে তিনি নিখোঁজ হন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর জীবনের ইতি ঘটলেও তাঁর সৃষ্টির আলো নিভে যায়নি।
জহির রায়হান আজও বেঁচে আছেন তাঁর কলমে, ক্যামেরায়, চরিত্রে ও সংলাপে—মানুষের চেতনায়, প্রতিবাদে এবং ভালোবাসায়। তাঁর শিল্পকর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকারের স্রষ্টারা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকেন।