হামলার জবাবে প্রস্তুত ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত—এমন বার্তাই আবারও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দৃঢ় ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনীর “আঙুল ট্রিগারে রাখা আছে”, অর্থাৎ প্রয়োজন হলে মুহূর্তের মধ্যেই শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে তারা সক্ষম ও প্রস্তুত। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় ঘনীভূত হচ্ছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ করে বলেন, সংঘাত এড়ানোর সুযোগ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তার এই মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক সম্ভাব্য সামরিক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প আরও সতর্ক করে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি “বিশাল আর্মাডা” ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত ও কঠোর অভিযান পরিচালনায় প্রস্তুত থাকবে। এই বক্তব্যের পরপরই তেহরান থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া আসে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “সীমিত হামলা” বলে কিছু নেই—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। তার ভাষায়, যেকোনো মাত্রার মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকেই যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য ধরা হবে। সে ক্ষেত্রে ইরানের জবাব হবে তাৎক্ষণিক, সর্বাত্মক ও নজিরবিহীন। তিনি ইঙ্গিত দেন, সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলসহ আগ্রাসনে জড়িত সব পক্ষ।

তবে একই সঙ্গে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছে না তেহরান। আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ইরান সবসময় পারস্পরিক লাভ ও সমতার ভিত্তিতে চুক্তিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ভয়ভীতি, চাপ কিংবা হুমকির পরিবেশে কোনো সমঝোতা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ইরান এমন একটি চুক্তি চায় যা একদিকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেবে। আরাগচির দাবি, তেহরানের নিরাপত্তা দর্শনে পারমাণবিক অস্ত্রের কোনো স্থান নেই এবং ইরান কখনোই তা অর্জনের চেষ্টা করেনি। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল গবেষণা ও বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

অন্যদিকে ইউরোপেও ইরানবিরোধী অবস্থান জোরালো হচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের পর ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হোক। আইআরজিসিকে ইরানের আদর্শিক ও প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইতোমধ্যে এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এখনো সে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

মানবাধিকার পরিস্থিতি ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। একটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় দেশটিতে ৬ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।

নিচের সারণিতে ইরান ইস্যুতে প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

পক্ষমূল অবস্থান
ইরানহামলা হলে তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব; আলোচনায় আগ্রহ, তবে চাপমুক্ত পরিবেশে
যুক্তরাষ্ট্রসামরিক চাপের হুঁশিয়ারি; নৌবাহিনীর উপস্থিতি জোরদার
ইউরোপের কয়েকটি দেশইরানের বিরুদ্ধে কড়া রাজনৈতিক অবস্থান; আইআরজিসি নিষিদ্ধের আলোচনা
মানবাধিকার সংগঠনবিক্ষোভে ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ

সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক ভাষা ও সামরিক হুঁশিয়ারির এই সমান্তরাল প্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সংঘাত এড়ানো যাবে কি না, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে আলোচনার টেবিল আদৌ বসে কি না—নাকি ট্রিগারে রাখা আঙুলই পরিস্থিতির নিয়তি নির্ধারণ করবে।