ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আহত বিক্ষোভকারীরা গ্রেপ্তার এড়াতে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ৩,১০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তাদের মতে, নিহতের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা সাধারণ পথচারী, যারা ‘দাঙ্গাবাজদের’ হামলার শিকার হয়েছেন।
এই মাসে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী যে সহিংস পদক্ষেপ নিয়েছে, তার পরিপূর্ণ তথ্য এখনও জানা যায়নি। ইন্টারনেট বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টিং নিষিদ্ধ থাকায় বিস্তারিত সংখ্যার নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, তারা ইরানে চলমান আন্দোলনে ৬,৩০১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে:
| ধরন | সংখ্যা |
|---|---|
| বিক্ষোভকারী | ৫,৯২৫ |
| শিশু | ১১২ |
| সাধারণ পথচারী | ৫০ |
| সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি | ২১৪ |
সংস্থা আরও জানিয়েছে, তারা ১৭,০৯১ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করছে। পাশাপাশি, কমপক্ষে ১১,০০০ জন বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন।
আহতরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিকিৎসা নিতে পারছেন না। তাই তাঁরা বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যেখানে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা জানাচ্ছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান করছে এবং মেডিকেল রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের একজন বিক্ষোভকারী (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন, “আমরা হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা নিয়েছি। নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের লক্ষ্য করেছিল। আমাদের পোষাক রক্তে ভেজা ছিল।”
তেহরানের একজন সার্জন নিমা বলেন, “আমরা ৯৬ ঘণ্টা ধরে, ঘুম ছাড়াই অস্ত্রোপচার করেছি। আহতদের গুলির ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে ধাপে ধাপে কাজ করেছি। অনেকের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা স্থায়ীভাবে অক্ষমতার কারণ হয়েছে।”
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালীন ১৩,০০০টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা করা হয়েছে, এবং প্রায় ২০০ জনকে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) জানিয়েছে, ইরানে কমপক্ষে পাঁচজন চিকিৎসক এবং একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনি গ্রেপ্তারের সময় বাড়িতে মারধরের শিকার হন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ (আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা) অভিযোগ আনা হয়েছে, যা মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি বহন করে।
বিক্ষোভ চলাকালীন আহতদের গোপন চিকিৎসার পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর নজর রেখে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর ঘটনাগুলো ইরানের সাম্প্রতিক মানবাধিকার সংকটের গভীরতা তুলে ধরছে।
