কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার আলোচিত জসিম উদ্দিন হত্যা মামলায় নাটকীয় মোড় নিয়েছে তদন্ত। যে স্ত্রী চোখের সামনে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ তুলে কাঁদতে কাঁদতে মামলা করেছিলেন, তদন্ত শেষে সেই স্ত্রীই এখন প্রধান আসামি। কয়েক মাস ধরে চলা অনুসন্ধান, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণে পুলিশের সামনে উন্মোচিত হয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতা, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ জানায়, গত বছরের ১০ আগস্ট রাতের কোনো এক সময় পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবুনিয়া সেগুন বাগিচা এলাকায় নিজ ঘরের ভেতর নৃশংসভাবে খুন হন জসিম উদ্দিন। পরদিন সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত ছিল, যা হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার ইঙ্গিত দেয়। ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী সেলিনা আক্তার পেকুয়া থানায় মামলা দায়ের করেন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীরা ঘরে ঢুকে তার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে, আর তিনি পাশের ঘরে লুকিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।
প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কয়েকজন প্রতিবেশীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তদন্তের শুরু থেকেই ঘটনাস্থলের আলামত ও বাদীর বক্তব্যে অসংগতি চোখে পড়ে। তদন্ত কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেন, ঘরের দরজা-জানালায় বাইরে থেকে জোরপূর্বক প্রবেশের সুস্পষ্ট চিহ্ন নেই। এছাড়া ঘটনার সময়, হামলার ধরন এবং বাদীর অবস্থান নিয়ে বয়ানে একাধিক গরমিল পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে মোবাইল ফোনের কললিস্ট, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং স্থানীয়দের দেওয়া গোপন তথ্য বিশ্লেষণে পুলিশ জানতে পারে, সেলিনা আক্তারের সঙ্গে একই এলাকার আব্দুর রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পুলিশের ধারণা, ঘটনার রাতে জসিম উদ্দিন ওই সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারেন বা আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন। এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় এবং তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক সুনয়ন বড়ুয়া জানান, প্রথম মামলার বয়ান ও বাস্তব আলামতের মধ্যে মিল না থাকায় বিকল্প দিকগুলো খতিয়ে দেখা হয়। এতে নতুন তথ্য উঠে আসে। ঘটনার প্রায় এক মাস সাত দিন পর নিহতের বাবা মো. নুর আহমদ বাদী হয়ে আরেকটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সেলিনা আক্তারকে প্রধান আসামি করে তার কথিত পরকীয়া সঙ্গী আব্দুর রাজ্জাকসহ আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
নতুন মামলার তদন্তে আগের মামলার অসংগতি, সাক্ষ্য ও প্রযুক্তিগত তথ্য একত্র করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয় যে, প্রথম মামলাটি ছিল বিভ্রান্তিমূলক। এরপর থেকে সেলিনা আক্তার আত্মগোপনে ছিলেন। অবশেষে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কক্সবাজার শহরের পিটি স্কুল এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনার তারিখ | ১০ আগস্ট |
| ঘটনাস্থল | জারুলবুনিয়া সেগুন বাগিচা, পেকুয়া |
| নিহত | জসিম উদ্দিন |
| প্রথম মামলার বাদী | সেলিনা আক্তার |
| নতুন মামলার বাদী | মো. নুর আহমদ (নিহতের বাবা) |
| প্রধান আসামি | সেলিনা আক্তার |
| গ্রেফতারের তারিখ | ২৩ জানুয়ারি |
এই মামলার অগ্রগতি স্থানীয়ভাবে যেমন চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে, তেমনি তদন্তের পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে।
