মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশটির সামরিক জান্তার চালানো ধারাবাহিক বিমান হামলায়। বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক মানুষের জমায়েত লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক, যা মিয়ানমারের ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাচিন রাজ্যের ভামো টাউনশিপের কাউং জার গ্রামে। কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) দেওয়া তথ্যমতে, জান্তার একটি যুদ্ধবিমান একটি প্রার্থনা সভাকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায়। একটি ব্যক্তিগত বাড়ির আঙিনায় ওই সভার আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে গ্রামের মানুষজন একজন সম্মানিত বয়োজ্যেষ্ঠের মৃত্যুর পর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়। ঘটনাস্থলেই ২২ জন নিহত হন এবং অন্তত ২৮ জন আহত হন, যাদের মধ্যে একাধিক শিশু রয়েছে।
কাউং জার গ্রামটি আশপাশের সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত বহু পরিবারের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, হামলার আকস্মিকতায় পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই তারা পাননি। হামলার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ঘরবাড়ি ও খোলা উঠোনে ছড়িয়ে আছে নিথর দেহ। কিছু মরদেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কেআইএর মুখপাত্র কর্নেল নাও বু দাবি করেছেন, হামলার সময় গ্রামটিতে কেআইএর কোনো সেনা বা স্থাপনা ছিল না। তিনি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলেন। তার ভাষায়, “তারা যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।” তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্কুল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও জনসমাবেশও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
একই দিনে মাগওয়ে অঞ্চলের অংলান টাউনশিপের তাত কোনে গ্রামেও আরেকটি বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় হামলাটি চালানো হয়। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। আহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী, যারা রান্না ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জান্তা বাহিনী প্রতিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থক বা নিয়ন্ত্রিত বলে সন্দেহভাজন এলাকাগুলোর বিরুদ্ধে আকাশপথে হামলার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। কিন্তু এসব হামলায় বারবার বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
নিচে সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদিত বিমান হামলার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| তারিখ | স্থান | লক্ষ্য/ঘটনা | নিহত | আহত |
|---|---|---|---|---|
| বৃহস্পতিবার | ভামো, কাচিন রাজ্য | প্রার্থনা সভা | ২২ | অন্তত ২৮ |
| বৃহস্পতিবার | অংলান, মাগওয়ে অঞ্চল | বিয়ের প্রস্তুতি | ৫ | কয়েকজন |
| মঙ্গলবার | রাখাইন সীমান্ত এলাকা | আটক কেন্দ্র | ২১ | প্রায় ৩০ |
এই ধারাবাহিক হামলাগুলো মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভীতি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষকদের সতর্কবার্তা, কার্যকর ও টেকসই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সহিংসতার চক্র থামার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর ফলে চলমান সংঘাতে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নিরীহ বেসামরিক জনগণকেই।
