জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

নিরাময় কেন্দ্রে যুবকের মৃত্যু: রোগীদের তান্ডব ও কেন্দ্র সিলগালা

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) সকালে পৌরসভার নওপাড়া গ্রামে অবস্থিত ‘আলোর দিশা’ নামক নিরাময় কেন্দ্রে রাজ্জাক মাতুব্বর (২৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর জানাজানি হতেই কেন্দ্রে থাকা অন্য রোগীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং ভবনজুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে যৌথভাবে অভিযান চালাতে হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরিবারের দাবি

নিহত রাজ্জাক মাতুব্বর ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া গ্রামের সামাদ মাতুব্বরের ছেলে। পরিবারের ভাষ্যমতে, রাজ্জাককে মাদকের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে গত মঙ্গলবার রাতে ওই কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে ভর্তির তিন দিনের মাথায় শুক্রবার সকালে কেন্দ্র থেকে জানানো হয় যে রাজ্জাক অসুস্থ। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ভাঙ্গা হাসপাতালে গিয়ে রাজ্জাকের নিথর মরদেহ দেখতে পান। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, রাজ্জাককে পিটিয়ে হত্যা করার পর কেন্দ্রের মালিক মিজানুর রহমান ও কর্মীরা পালিয়ে গেছেন।

নিরাময় কেন্দ্রের ঘটনা ও বর্তমান অবস্থা:

তথ্যের বিবরণবিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান
নিহত যুবকরাজ্জাক মাতুব্বর (২৮)।
কেন্দ্রের নাম ও স্থানআলোর দিশা নিরাময় কেন্দ্র, নওপাড়া, ভাঙ্গা।
ভর্তির তারিখ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ (মঙ্গলবার রাত)।
মৃত্যুর অভিযোগবেধড়ক পিটুনি ও শারীরিক নির্যাতন।
উদ্ধারকৃত রোগীর সংখ্যা৫১ জন (তাঁদের পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে)।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেন্দ্র সিলগালা ও মামলার প্রস্তুতি চলমান।
অভিযুক্তের অবস্থামালিকসহ সকল কর্মচারী পলাতক।

বিক্ষুব্ধ রোগীদের বিদ্রোহ ও উদ্ধার অভিযান

রাজ্জাকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার চেষ্টা করলে কেন্দ্রের ভেতরে অবরুদ্ধ থাকা রোগীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী তালাবদ্ধ দরজা ও জানালার কাচ ভেঙে বেরিয়ে আসেন। তাঁরা কেন্দ্রের আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেক রোগীর অভিযোগ, নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে সেখানে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে রোগীদের শান্ত করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সুরতহাল ও আইনি পদক্ষেপ

ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, নিহতের শরীরে আঘাতের বেশ কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং তাঁর নাক-কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে দেখা গেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে জেলা মাদক নিরাময় কেন্দ্রের উপপরিচালক শিরিন আক্তার এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

কেন্দ্র সিলগালা ও রোগীদের প্রত্যাবাসন

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনিয়ম ও সহিংসতার অভিযোগে ‘আলোর দিশা’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রটি তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা ৫১ জন রোগীকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিকেল পর্যন্ত অধিকাংশ রোগীকে তাঁদের স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জেলা মাদক নিরাময় কেন্দ্র সূত্র নিশ্চিত করেছে।

উপসংহার

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সেবার মান এবং নিরাপত্তার বিষয়টি এই নিষ্ঠুর ঘটনার মাধ্যমে আবারও বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে পড়ল। সুস্থ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি নিরাময় কেন্দ্রগুলো মরণকূপে পরিণত হয়, তবে তা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। পলাতক মালিক মিজানুর রহমানকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনাই এখন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মূল দাবি।

Tags :

Tanjim

Recent News