পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ইয়োয়েরি মুসেভেনি পুনরায় জয়ী হওয়ার পর দেশজুড়ে বিরোধী নিধন অভিযানে নেমেছে নিরাপত্তা বাহিনী। উগান্ডার সামরিক বাহিনীর প্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের পুত্র জেনারেল মুুহোজি কাইনেরুগাবা শুক্রবার প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, এ পর্যন্ত ৩০ জন বিরোধী সমর্থককে হত্যা করা হয়েছে এবং অন্তত দুই হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।
Table of Contents
নির্বাচন ও জালিয়াতির অভিযোগ
গত ১৫ জানুয়ারি উগান্ডায় অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ৮১ বছর বয়সী ইয়োয়েরি মুসেভেনিকে সপ্তম মেয়াদে জয়ী ঘোষণা করা হয়। তবে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক উত্তেজনা। নির্বাচনের দিন পুরো দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো ধরণের অনিয়মের তথ্য বাইরের বিশ্ব জানতে না পারে। জনপ্রিয় পপ তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা বিরোধী দল ন্যাশনাল ইউনিটি প্ল্যাটফর্ম (এনইউপি)-এর নেতা ববি ওয়াইন (রবার্ট কিয়াগুলানিই) এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও জালিয়াতির মাধ্যমে মুসেভেনিকে বিজয়ী করা হয়েছে।
উগান্ডা নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতির পরিসংখ্যান:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বর্তমান প্রেসিডেন্ট | ইয়োয়েরি মুসেভেনি (ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৬ থেকে)। |
| প্রধান বিরোধী নেতা | ববি ওয়াইন (ন্যাশনাল ইউনিটি প্ল্যাটফর্ম)। |
| নিহতের সংখ্যা | ৩০ জন (সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী)। |
| গ্রেপ্তারের সংখ্যা | ২,০০০ জন বিরোধী সমর্থক ও নেতা। |
| সরকারের অভিযোগ | বিরোধীরা ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘অরাজকতা সৃষ্টিকারী’। |
| আন্তর্জাতিক উদ্বেগ | জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কঠোর সমালোচনা। |
জেনারেল কাইনেরুগাবার কঠোর অবস্থান
প্রেসিডেন্টের ছেলে এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল কাইনেরুগাবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একের পর এক পোস্টে বিরোধীদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, এনইউপি নেতাদের অধিকাংশই বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন এবং তাঁদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। সামরিক বাহিনীর এই উন্মুক্ত হুমকি ও ৩০ জন মানুষের মৃত্যুর দায় স্বীকার করে নেওয়াকে বিশ্লেষকরা একনায়কতন্ত্রের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
ববি ওয়াইনের আত্মগোপন ও আর্তনাদ
ববি ওয়াইন অভিযোগ করেছেন যে, কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁর শত শত সমর্থককে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই গ্রেপ্তারের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা যাতে কেউ ভোট চুরির প্রতিবাদ করতে না পারে। বর্তমানে নিজের প্রাণের মায়ায় আত্মগোপনে থাকা এই নেতা বিশ্ববিবেকের কাছে উগান্ডার মানুষের জন্য সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।
বৈশ্বিক উদ্বেগ ও জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া
উগান্ডার এই অরাজক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তাঁর মুখপাত্র স্টেফান দ্যুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মহাসচিব বিরোধী কর্মীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অত্যন্ত চিন্তিত। তিনি উগান্ডা সরকারকে অবিলম্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মুসেভেনি সরকার এই সব সমালোচনাকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
উপসংহার
উগান্ডার এই সংকট কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থারই এক প্রতিচ্ছবি। চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন নেতার গদি রক্ষা করতে যখন সামরিক বাহিনী নাগরিকদের ওপর বন্দুক তাক করে, তখন সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ববি ওয়াইনের অনুসারীদের ওপর চলমান এই রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন উগান্ডাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
