শিবগঞ্জে ভাঙল মিত্রতা: মান্না বনাম বিএনপি-জামায়াতের ত্রিমুখী লড়াই

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রতায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপির সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের বিচ্ছেদ এখন চূড়ান্ত। ফলে এই আসনে জোটবদ্ধ লড়াইয়ের পরিবর্তে শুরু হতে যাচ্ছে এক নাটকীয় ত্রিমুখী সংঘাত। গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রতীক বরাদ্দের পর দেখা গেছে, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না তাঁর দলীয় প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাঁর বিপরীতে ‘ধানের শীষ’ নিয়ে লড়ছেন বিএনপির মীর শাহে আলম এবং ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে মাঠে আছেন জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান।

বিচ্ছেদের নেপথ্য ও আইনি জটিলতা

শুরুতে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাকে জোটের প্রার্থী হিসেবে ভাবা হলেও শেষ মুহূর্তে বিএনপি শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দেয়। অন্যদিকে, রিটার্নিং কর্মকর্তা ঋণখেলাপির অভিযোগে মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল করলে এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় তিনি এখন স্বমহিমায় নির্বাচনি ময়দানে। নাগরিক ঐক্যের স্থানীয় নেতাদের দাবি, বিএনপি শেষ মুহূর্তে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তাঁদের নেতার জনপ্রিয়তাকে অবজ্ঞা করেছে। অন্যদিকে বিএনপি শিবগঞ্জকে ‘ধানের শীষের দুর্গ’ দাবি করে এককভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভোটার পরিসংখ্যান ও নির্বাচনের হালচাল

বগুড়া-২ আসনটি শুধুমাত্র শিবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানকার নির্বাচনি সমীকরণ মূলত গ্রামীণ ও শহরতলির ভোটারদের মানসিকতার ওপর নির্ভর করে।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের ভোটার তথ্য:

ক্যাটাগরিভোটার সংখ্যা
মোট ভোটার৩,৪২,১৫৫ জন
পুরুষ ভোটার১,৭১,৪৯৭ জন
নারী ভোটার১,৭০,৬৫৩ জন
তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া)৫ জন
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী৩ জন (বিএনপি, জামায়াত ও নাগরিক ঐক্য)

মান্নার নির্বাচনি ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

মাহমুদুর রহমান মান্না এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো এই আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার চেষ্টা করছেন। ১৯৯১ সালে তিনি জনতা মুক্তি পার্টি থেকে পেয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ১৮০ ভোট। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে লড়াই করে তিনি যথাক্রমে ১৯ হাজার ৮৭১ এবং ৩৬ হাজার ৭৫০ ভোট পান। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি ৬২ হাজার ৩৯৩ ভোট পেয়ে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। তবে এবার জোটের কোনো সমর্থন ছাড়া কেবল নিজের ‘কেটলি’ প্রতীক নিয়ে তিনি কতটুকু সফল হবেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার

বিএনপি প্রার্থী মীর শাহে আলম জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় পর শিবগঞ্জ ‘জোটের অভিশাপ’ মুক্ত হয়েছে এবং ভোটাররা ধানের শীষের পক্ষেই রায় দেবেন। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদুজ্জামান তাঁর ১৯৯১ সালের সংসদ সদস্য থাকাকালীন উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, শিবগঞ্জের জনগণ জামায়াতকে ভালোবাসে এবং এবারও তার প্রতিফলন ঘটবে।

এদিকে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছু হত্যা মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে লাঙ্গল প্রতীকের প্রচারণা প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে, যা ভোটের মাঠকে মূলত বিএনপি, জামায়াত ও মান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে।

উপসংহার

বগুড়া-২ আসনে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়—ভোট কি দলের প্রতীকে পড়বে নাকি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজে? মীর শাহে আলমের সাংগঠনিক শক্তি, মান্নার জাতীয় পরিচিতি এবং জামায়াতের ক্যাডারভিত্তিক ভোট ব্যাংক—এই তিনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে বাজিমাত করবেন, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে দেশবাসীকে।