ভিক্ষার আড়ালে কোটিপতি: তিন বাড়ি ও গাড়ির মালিক মঙ্গিলাল

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরটি তার পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিকতার জন্য পরিচিত। তবে এই শহরের জনাকীর্ণ শরাফা বাজারের অলিগলিতে লুকিয়ে ছিল এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতির গল্প। দীর্ঘকাল ধরে সাধারণ মানুষের করুণা ও সহানুভূতি কুড়িয়ে আসা এক ‘অসহায়’ ভিক্ষুকের আসল পরিচয় যখন প্রকাশ পেল, তখন খোদ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছেন। জরাজীর্ণ বেশধারী এই ভিক্ষুক আসলে কোনো নিঃস্ব ব্যক্তি নন, বরং তাঁর রয়েছে আলিশান বাড়ি, গাড়ি এবং সুদের রমরমা কারবার।

অসহায়ত্বের ছদ্মবেশ ও সুনিপুণ অভিনয়

মঙ্গিলাল নামের এই ব্যক্তি শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার সুযোগ নিয়ে এক অভিনব উপায়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতেন। বেয়ারিং লাগানো একটি লোহার ছোট গাড়িতে বসে তিনি বাজারের ব্যস্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। দুই হাতে একজোড়া জুতা নিয়ে তিনি এমনভাবে বসে থাকতেন যাতে পথচারীরা তাঁর করুণ দশা দেখে নিজ থেকেই টাকা দেন। তিনি কখনোই কারও কাছে সরাসরি হাত পাততেন না, বরং তাঁর ‘মৌন অভিনয়ই’ ছিল অর্থ উপার্জনের প্রধান হাতিয়ার।

সম্প্রতি ইন্দোর প্রশাসন শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে ‘নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগে’র মাধ্যমে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। গত শনিবার গভীর রাতে কুষ্ঠরোগীর ছদ্মবেশে থাকা মঙ্গিলালকে আটক করার পরই তাঁর এই কোটিপতি জীবনের রহস্য উন্মোচিত হয়।

ভিক্ষা থেকে মহাজনি কারবার

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, মঙ্গিলালের মূল আয়ের উৎস কেবল ভিক্ষা ছিল না। তিনি ভিক্ষার টাকাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে বড় ধরনের সুদের ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিদিন ভিক্ষা করে তিনি প্রায় ৫০০ রুপি সংগ্রহ করতেন এবং সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে শুরু হতো তাঁর ‘মহাজনি’ রূপ। তিনি স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীদের সুদে টাকা ধার দিতেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে তাঁর লগ্নিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি, যেখান থেকে প্রতিদিন তিনি ১ থেকে ২ হাজার রুপি সুদ পেতেন।

মঙ্গিলালের সম্পদের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান:

সম্পদের ধরণবিস্তারিত বিবরণ
আবাসিক সম্পদমোট ৩টি বাড়ি (যার মধ্যে একটি তিনতলা বিশিষ্ট ভবন)।
যানবাহনএকটি মারুতি সুজুকি গাড়ি ও ৩টি অটোরিকশা।
আয়ের উৎসঅটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দৈনিক ভাড়া।
সুদের ব্যবসাক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রদানকৃত ঋণের মুনাফা।
সরকারি সুবিধাতথ্য গোপন করে ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’র ঘর গ্রহণ।
কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি২০২১ সাল থেকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে সম্পদ আহরণ।

তথ্য গোপন ও সরকারি সুবিধা ভোগ

মঙ্গিলালের চাতুর্য কেবল ভিক্ষাবৃত্তিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজের পর্যাপ্ত সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি তথ্য গোপন করে সরকারি প্রকল্পের ঘর হাতিয়ে নিয়েছেন। নিজের মারুতি সুজুকি গাড়ি এবং তিনটি অটোরিকশা তিনি ভাড়ায় খাটিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা দিনেশ মিশ্র জানান, মঙ্গিলালকে আপাতত উজ্জয়িনীর সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তাঁর সমস্ত ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির দলিল তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

সামাজিক প্রভাব ও প্রশাসনের বার্তা

ইন্দোর প্রশাসনের জরিপ অনুযায়ী, শহরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ভিক্ষুক শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার পাঁচশ জন এই পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। মঙ্গিলালের ঘটনাটি সমাজকে এই বার্তাই দেয় যে, পথেঘাটে দেখা যাওয়া সব ভিক্ষুকই অভাবী নন। মানুষের দানশীলতাকে পুঁজি করে অনেকেই এভাবে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ছেন।

উপসংহার

মঙ্গিলালের এই ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধের খবর নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও দানশীলতার অপব্যবহারের এক চরম উদাহরণ। প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাঁর অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।