বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক জবাবদিহির প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানের নামে বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য প্রকাশের পর। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পরিচালিত এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, তিনি ১১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে মোট ১৫৯টি হিসাব পরিচালনা করেছেন। এসব হিসাবে মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৩৯১ কোটি টাকার সমপরিমাণ (৩৯১ মিলিয়ন টাকা), আর সর্বশেষ সম্মিলিত স্থিতি ছিল আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন সাবেক শীর্ষ নিয়ন্ত্রকের নামে এত বিপুলসংখ্যক সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসাব, স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের জমা ও উত্তোলন—এসব বিষয় সাধারণ ব্যক্তিগত ব্যাংকিং আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণেই লেনদেনগুলোকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন-এ পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, বিএফআইইউ নিজে মামলা দায়ের না করলেও সম্ভাব্য অনিয়ম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা তাদের আইনগত দায়িত্ব।
প্রতিবেদনে একটি নির্দিষ্ট লেনদেন ধারার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ২০২১ সালের আগস্টে গুলশানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর একটি শাখায় মনিরুজ্জামানের নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার দুই দিনের মাথায় ‘এস আলম ভেজিটেবল অয়েল’-এর একটি হিসাব থেকে ২ কোটি টাকার পে-অর্ডার জমা হয়। পরদিনই একই শাখায় দুটি ৭০ লাখ টাকা ও একটি ৬০ লাখ টাকার তিনটি এফডিআর খোলা হয়। তদন্তকারীদের মতে, নথিতে এই অর্থের উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া একই হিসাবের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার থেকে নিয়মিত অর্থ জমার তথ্য পাওয়া যায়। প্রায় ২৭ মাসে মোট ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ‘বেতন’ ও ‘যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা’ হিসেবে জমা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অবসরোত্তর সময়ে মনিরুজ্জামান এসএস পাওয়ারের বাণিজ্যিক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলেও নথিতে বলা হয়েছে।
২০২৩ সালের মার্চে গুলশানে প্রাইম ব্যাংক-এর একটি শাখায় তার নামে খোলা সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রেও একই দিনে এফডিআর খোলার নজির পাওয়া যায়, যা তদন্তকারীদের কাছে অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
মনিরুজ্জামান ২০১৬ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তিন বছরের মেয়াদ শেষে বয়সসীমা পর্যন্ত বাড়ানো দায়িত্ব পালন করে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসর নেন। দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি পরিদর্শন-সংশ্লিষ্ট বিভাগে যুক্ত ছিলেন; ওই সময়েই ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও কর্মকর্তারা ক্যাশলেস লেনদেন জোরদার ও নজরদারি ব্যবস্থার উন্নয়নের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অভিযোগের জবাবে মনিরুজ্জামান বলেন, ২ কোটি টাকার জমাটি একটি আবাসিক সম্পত্তি বিক্রির অর্থ এবং তার সব হিসাব কর নথিতে ঘোষিত। তিনি এস আলম গ্রুপ থেকে কোনো অনিয়মিত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং হিসাবের সংখ্যা অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেন।
সন্দেহজনক লেনদেনের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ব্যাংকের সংখ্যা | ১১ |
| মোট হিসাব | ১৫৯ |
| মোট লেনদেন | প্রায় ৩৯১ মিলিয়ন টাকা |
| সর্বশেষ স্থিতি | প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা |
| এককালীন বড় জমা | ২ কোটি টাকা |
| নিয়মিত জমা | ২৭ মাসে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা |
সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনা নিয়ন্ত্রক পদে থাকা ও অবসরোত্তর কর্মসংস্থানের সীমারেখা, ব্যক্তিগত বড় অঙ্কের লেনদেনের নজরদারি এবং বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের তদারকি কাঠামোর দৃঢ়তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
