ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনসুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘সার্বজনীন বীমা কভারেজ’ (Universal Insurance Coverage) অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হাতে নিয়েছে দেশটির সরকার। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট একটি তুরুপের তাস হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। আসন্ন বাজেটে বীমা খাতকে আরও গণমুখী এবং সাশ্রয়ী করতে বিশেষত গ্রামীণ নারী ও কৃষকদের জন্য যুগান্তকারী কিছু ঘোষণা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জন ধন যোজনার মাধ্যমে বীমা অন্তর্ভুক্তি
ভারতের বীমা খাতের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে অতিরিক্ত নথিপত্র এবং জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া। এই বাধা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (PMJDY)-কে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমানে ৫৫ কোটিরও বেশি জন ধন অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ নারী গ্রাহকদের অধীনে। যদি এই অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গেই সরাসরি বীমা সুবিধাকে যুক্ত করে দেওয়া যায়, তবে কোটি কোটি মানুষ আলাদা কোনো আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীমার আওতায় চলে আসবে। এতে করে নীতিনির্ধারকদের জন্য ‘ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে জন ধন অ্যাকাউন্টগুলো একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাজেটের সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো নিচের সারণিতে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:
কেন্দ্রীয় বাজেটে বীমা খাতের সম্ভাব্য সংস্কার পরিকল্পনা
| বিষয়ের ক্ষেত্র | প্রস্তাবিত লক্ষ্য ও উদ্যোগ |
| মূল লক্ষ্য | ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিককে বীমার আওতায় আনা। |
| প্রধান মাধ্যম | জন ধন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বীমা পরিষেবার সরাসরি সম্প্রসারণ। |
| বিশেষ গুরুত্ব | গ্রামীণ নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বীমা পণ্য। |
| কৃষি খাত | জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ফসল বীমার পরিধি বৃদ্ধি। |
| প্রযুক্তিগত সেবা | ডিজিটাল অটো-ডেবিট এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি (Claim Settlement)। |
| প্রিমিয়াম হার | প্রান্তিক মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও কিস্তিভিত্তিক প্রিমিয়াম মডেল। |
নারী ও কৃষি খাতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা বলয়
গ্রামীণ নারীদের জন্য আলাদা বীমা পণ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক সময় গ্রামীণ পরিবারগুলোকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। বাজেটে যদি এমন কোনো পণ্য আনা হয় যা সরাসরি জন ধন অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত থাকে, তবে তা এই পরিবারগুলোর জন্য একটি মজবুত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে।
অন্যদিকে, কৃষকদের জন্য ‘জলবায়ু ঝুঁকি বীমা’ (Climate Risk Insurance) হতে পারে এবারের বাজেটের অন্যতম আকর্ষণ। বর্তমান সময়ে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। কৃষকদের এই আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে বর্তমান ফসল বীমা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দুর্যোগবান্ধব করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগের পর দ্রুততম সময়ে যাতে কৃষকের হাতে বীমার টাকা পৌঁছায়, সেজন্য স্যাটেলাইট ডেটা বা প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষতি নিরূপণ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ভারতের এই ‘ইন্স্যুরেন্স পুশ’ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর: প্রিমিয়াম কতটা সাশ্রয়ী, প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ এবং দাবি নিষ্পত্তি কতটা স্বচ্ছ। শহরকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের করে বীমাকে যদি গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবেই ২০৪৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। নীতিনির্ধারকদের মতে, বীমা যখন কেবল একটি আর্থিক পরিষেবা না হয়ে গ্রামীণ জনপদের জীবনরক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হবে, তখনই ভারত প্রকৃত অর্থে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শিখরে পৌঁছাবে।
