২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করার কারণে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুসরাত জাহান সনিয়াকে যে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা সভ্য সমাজের জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দীর্ঘ ১৪ দিন কারাবরণ, চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মানসিক ও সামাজিক লাঞ্ছনার পর অবশেষে তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি পুনরায় তাঁর পেশাগত জীবনে ফেরার সুযোগ পান।
অমানবিক গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট
নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন সারাদেশে শিক্ষার্থীরা রাজপথে, তখন ৩ আগস্ট ২০১৮ সালে নুসরাত অন্যের একটি পরামর্শমূলক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এর পরদিন ৪ আগস্ট মধ্যরাতে পুলিশ তাঁকে আটক করে। ৫ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ (২) ধারায় মামলা করা হয়। সাত মাসের গর্ভবতী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে থানায় ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় এবং যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়। নুসরাত জানান, যাত্রাপথে এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে তাঁকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার মিথ্যা অভিযোগে জেরা করে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
নুসরাত জাহানের এই দীর্ঘ সংগ্রামের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
নুসরাত জাহানের ৭ বছর ৪ মাসের লড়াইয়ের সারসংক্ষেপ
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ |
| বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার | ৩ আগস্ট ২০১৮ (পোস্ট শেয়ার), ৪ আগস্ট ২০১৮ (আটক)। |
| শারীরিক অবস্থা | ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা (গ্রেপ্তারের সময়)। |
| চাকরিচ্যুতি | ৬ আগস্ট ২০১৮ (সাময়িক বরখাস্ত)। |
| কারাবাসের মেয়াদ | ১৪ দিন (পটুয়াখালী জেলা কারাগার)। |
| লড়াইয়ের সময়কাল | ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন। |
| আইনি ফলাফল | ২২ মে ২০২৫ (হাইকোর্ট কর্তৃক মামলা বাতিল ও অব্যাহতি)। |
| পুনর্বহাল | ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ (কাজে যোগদান)। |
| ক্ষতিপূরণ ও পাওনা | বরখাস্তকালীন সময়ের সকল বকেয়া বেতন ও ভাতা প্রাপ্য। |
কারাগার ও সামাজিক যন্ত্রণার জীবন
কারাগারে থাকাকালীন নুসরাতকে চরম কষ্টের মধ্যে রাত কাটাতে হয়েছে। মেঝেতে পাতলা কম্বল পেতে ঘুমানো এবং অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তিনি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর শুরু হয় নতুন যুদ্ধ—সামাজিক বর্জন। এলাকার মানুষ ভয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং প্রতিবেশী ও পরিচিতদের কটু মন্তব্য তাঁকে দীর্ঘ দুই বছর গৃহবন্দী থাকতে বাধ্য করে। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও তাঁর জামিনের বিরোধিতা করে গর্ভকালীন নথিপত্রকে ‘ভুয়া’ বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন।
ন্যায়বিচার ও প্রত্যাবর্তনের গল্প
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবীদের সহায়তায় দীর্ঘ সাত বছর পর হাইকোর্ট নুসরাতকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা আইনের অপব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নুসরাতের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে তিনি তাঁর হারানো পেশায় ফিরেছেন এবং বেতনের বকেয়া টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। নুসরাতের গর্ভস্থ সেই শিশুটি এখন সাত বছরের বালক, যে আজ বড় হয়ে মায়ের কষ্টের ইতিহাস বুঝতে শিখেছে।
সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, নুসরাত জাহানের এই ঘটনাটি কেবল একটি একক উদাহরণ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর অপব্যবহারের একটি নজির। ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেনের মতে, রাষ্ট্রকে এই অন্যায়ের জন্য নুসরাতকে আনুষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং যারা এই অমানবিক ঘটনার সাথে জড়িত ছিল, তাদের তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। নুসরাত এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন, তবে তাঁর মনের গহীনে সেই ৭ বছর ৪ মাসের অন্ধকারের ক্ষত চিরকাল রয়ে যাবে।
