ফুটবলারদের ‘থ্রি-ডি অবতার’: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির এক নতুন বিপ্লব

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের বৃহত্তম আসর। এই আসরকে কেবল মাঠের লড়াইয়ে নয়, বরং প্রযুক্তির দিক থেকেও সর্বকালের সেরা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সম্প্রতি লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক শো -তে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা করেছেন যে, আসন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক খেলোয়াড়ের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ত্রিমাত্রিক ‘ডিজিটাল অবতার’ তৈরি করা হবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি’-কে নিখুঁত ও বিতর্কহীন করে তোলা।

কেন প্রয়োজন ডিজিটাল স্ক্যান ও থ্রি-ডি প্রতিরূপ?

বর্তমানে ফুটবল ম্যাচে অফসাইড নির্ধারণের জন্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এবং ক্যামেরা ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। প্রিমিয়ার লিগের মতো বড় আসরে ৩০টি ক্যামেরা ব্যবহার করে একজন খেলোয়াড়ের শরীরের ১০ হাজারটি ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত যে গ্রাফিক্যাল মডেলগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অনেকটা কঙ্কালের মতো সাধারণ জ্যামিতিক কাঠামো মাত্র। ফলে খেলোয়াড়ের প্রকৃত শরীরের গঠন বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুক্ষ্ম অবস্থানের সঙ্গে তা অনেক সময় শতভাগ মেলে না।

ফিফা চায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শরীরের বাস্তব মাপের ওপর ভিত্তি করে একটি ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করতে। এর ফলে ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের (৪৮টি দলের ২৬ জন করে) প্রত্যেকের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আলাদাভাবে এআই সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। যখন কোনো খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে থাকবেন, তখন ক্যামেরা কোনো সাধারণ মডেল নয়, বরং সেই খেলোয়াড়ের নিজস্ব ‘অবতার’ ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেবে।

২০২৬ বিশ্বকাপের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মূল দিকগুলো নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:

২০২৬ বিশ্বকাপ: এআই প্রযুক্তি ও ডিজিটাল স্ক্যানিং একনজরে

ফিচারের নামবিস্তারিত বিবরণপ্রযুক্তির উদ্দেশ্য
ডিজিটাল স্ক্যান১ সেকেন্ডের থ্রি-ডি স্ক্যানিং প্রক্রিয়া।নিখুঁত শারীরিক পরিমাপ সংগ্রহ করা।
এআই অবতার১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ।গ্রাফিক্যাল বিভ্রান্তি দূর করা।
SAOT আপডেটসেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি।অফসাইডের সিদ্ধান্ত কয়েক সেকেন্ডে দেওয়া।
ডেটা পয়েন্টপ্রতি খেলোয়াড়ের ১০,০০০ মুভমেন্ট ট্র্যাকিং।বল ও খেলোয়াড়ের গতির সমন্বয়।
প্রয়োজনীয়তা১০৪টি ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত বিশ্লেষণ।রেফারির ভুলের সম্ভাবনা শূন্যে আনা।

বিভ্রান্তি দূর করার কৌশল

সাম্প্রতিক সময়ে প্রিমিয়ার লিগের নিউক্যাসল বনাম ম্যানচেস্টার সিটি ম্যাচে রুবেন দিয়াজের একটি অফসাইড গ্রাফিকস নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। সেখানে কম্পিউটার জেনারেটেড ছবিতে দিয়াজকে যেভাবে লাফাতে দেখা গিয়েছিল, তা আসল ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। ফিফা সভাপতি জানান, খেলোয়াড়দের সঠিক শারীরিক গঠন স্ক্যান করা হলে এমন ত্রুটি আর ঘটবে না। এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে ফ্ল্যামেঙ্গো ও পিরামিডস এফসির মধ্যকার ম্যাচে সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।

স্ক্যানিং পদ্ধতি ও গোল-লাইন প্রযুক্তির নতুন ধাপ

খেলোয়াড়দের এই স্ক্যানিং প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ। বিশ্বকাপের আগে প্রতিটি দলের নির্ধারিত ফটোশুটের সময় খেলোয়াড়দের একটি বিশেষ স্ক্যানিং চেম্বারে প্রবেশ করতে হবে। মাত্র এক সেকেন্ডে তাদের শরীরের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ তৈরি হয়ে যাবে। এছাড়া ফিফা আরও একটি নতুন প্রযুক্তির কথা জানিয়েছে, যা গোল হওয়ার আগমুহূর্তে বল মাঠের বাইরে গিয়েছিল কি না তা নির্ধারণ করবে এবং ‘লাইন অফ সাইট’ অফসাইড (যখন একজন খেলোয়াড় গোলরক্ষকের দৃষ্টিসীমায় বাধা তৈরি করেন) নির্ণয় করতে রিয়েল-টাইম থ্রি-ডি রিক্রিয়েশন প্রদান করবে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, এই প্রযুক্তি ফুটবলকে আরও স্বচ্ছ ও রোমাঞ্চকর করে তুলবে। ভক্তরা টিভিতে আরও উন্নত গ্রাফিকস দেখতে পাবেন এবং রেফারির সিদ্ধান্তের জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না।