আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করার অভিযোগে ‘আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি, ২০২৬) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিআইডি জানায় যে, বুধবার রাজধানীর গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এই মামলাটি রুজু করা হয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রতিষ্ঠানটির নথিপত্র এবং ব্যাংক লেনদেনে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
অভিযুক্তদের তালিকা ও পদের বিবরণ
মামলায় আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। আসামিরা হলেন:
১. আজিজুল ইসলাম (চেয়ারম্যান)
২. মো. আজিমুল ইসলাম (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)
৩. রফিকুল ইসলাম (স্বাধীন পরিচালক)
৪. তানিম নোমান সাত্তার (স্বাধীন পরিচালক)
৫. আজহারুল ইসলাম (স্বাধীন পরিচালক)
জালিয়াতির কৌশল ও অনুসন্ধানের ফলাফল
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশের (এক্সিম ব্যাংক) গুলশান করপোরেট শাখা থেকে ছয়টি এলসি বা সেলস কনট্রাক্ট ব্যবহার করে ৫৬টি রপ্তানি ফরম (EXP) গ্রহণ করেছিলেন। এসব ফরমের বিপরীতে তৈরি পোশাক বা রেডিমেড গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করার কথা থাকলেও তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানিমূল্য দেশে ফিরিয়ে আনেননি।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ভিন্ন পণ্য এনেছে অথবা পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি মূল্য প্রদর্শন করেছে। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। সিআইডি এই জালিয়াতি নিশ্চিত হতে কোম্পানির কারখানা, কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের সকল নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে।
নিচে মামলার প্রধান তথ্যসমূহ সারণি আকারে উপস্থাপন করা হলো:
আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ অর্থ পাচার মামলার সারসংক্ষেপ
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ |
| অভিযুক্ত কোম্পানি | আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। |
| মামলার ধারা | মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন। |
| পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ | ২৮ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। |
| লেনদেনকৃত ব্যাংক | এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক)। |
| অপরাধের কৌশল | রপ্তানিমূল্য দেশে না আনা এবং আমদানিতে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা। |
| তদন্তকারী সংস্থা | ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট, সিআইডি। |
| মামলা দায়েরের স্থান | গুলশান থানা, ঢাকা। |
রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ও সিআইডির কঠোর বার্তা
সিআইডির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ও পরিমাণে গরমিল দেখিয়ে এই বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করা হয়েছে। এটি কেবল একটি কোম্পানির অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের আঘাত। অর্থ পাচারের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বর্তমানে সিআইডি এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। এই চক্রের সাথে অন্য কোনো অজ্ঞাতপরিচয় সদস্য বা কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিআইডি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারকারীদের দমনে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং জড়িতদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
