রংপুর বিভাগের চার জেলা—রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট—এখন এক নীরব পরিবেশগত সংকটের মুখে। কৃষিজমির উপরিভাগের সবচেয়ে উর্বর অংশ, যাকে ‘টপ সয়েল’ বলা হয়, নির্বিচারে কেটে নিয়ে ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, কমছে ফসল উৎপাদন, আর দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়ছে এই অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
কৃষিবিদদের ভাষায়, টপ সয়েল হলো মাটির প্রাণ। এই স্তরেই জৈব পদার্থ, পুষ্টি উপাদান ও উপকারী অণুজীবের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। একবার এই স্তর তুলে নিলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তা পুনরুদ্ধার হতে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অথচ ইটভাটার কাঁচামাল হিসেবে এই টপ সয়েলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কারণ এতে তৈরি ইট শক্ত ও মানসম্মত হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের এই চার জেলায় বর্তমানে অন্তত ৫৯৫টি ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে, যেগুলোর বড় অংশ কৃষিজমির উর্বর মাটির ওপর নির্ভরশীল। একটি ইট তৈরি করতে গড়ে প্রায় ৫ কেজি মাটি লাগে। বছরে একটি ইটভাটায় গড়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট উৎপাদিত হয়। ফলে একটি ভাটার জন্যই বছরে হাজার হাজার টন কৃষিজমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে।
চার জেলার ইটভাটা ও সাম্প্রতিক ব্যবস্থা (সংক্ষিপ্ত চিত্র)
| জেলা | আনুমানিক ইটভাটা সংখ্যা | সাম্প্রতিক অভিযানে জরিমানা |
|---|---|---|
| রংপুর | উল্লেখযোগ্য অংশ | অন্তর্ভুক্ত |
| গাইবান্ধা | উল্লেখযোগ্য অংশ | অন্তর্ভুক্ত |
| কুড়িগ্রাম | উল্লেখযোগ্য অংশ | অন্তর্ভুক্ত |
| লালমনিরহাট | উল্লেখযোগ্য অংশ | অন্তর্ভুক্ত |
| মোট | ৫৯৫টি | ১৫ লাখ টাকা (১২ ভাটা) |
গত এক সপ্তাহে চার জেলায় যৌথ অভিযানে ১২টি ইটভাটাকে মোট ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও উলিপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় এসব অভিযান পরিচালিত হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, জরিমানা দিয়েই অনেক ভাটা আবার আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইটভাটা মালিকদের দাবি, কৃষকেরা স্বেচ্ছায় মাটি বিক্রি করেন। তাঁদের যুক্তি—ইটভাটা বন্ধ হলে উন্নয়নকাজ থমকে যাবে এবং বহু শ্রমিক বেকার হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। কৃষকেরা বলছেন, পাশের জমি থেকে একসঙ্গে মাটি কেটে নেওয়ায় তাঁদের জমি নিচু হয়ে যায়, সেচ ও চাষাবাদ ব্যাহত হয়। ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা নিজের জমির মাটি বিক্রি করতে সম্মত হন।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিভাগীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়—ইটভাটায় বিকল্প কাঁচামাল ব্যবহার, কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন বাস্তবায়নের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই উর্বর মাটি রক্ষার সংকট মোকাবিলা করতে।
