সুরস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের অবিনাশী সুরের উত্তরাধিকার

বাংলা গানের আকাশে যে কজন নক্ষত্র ধ্রুবতারার মতো জ্বলে আছেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সুর মানেই যেন এক টুকরো বাংলাদেশ, মাটির গন্ধ আর হৃদয়ের গভীর থেকে আসা হাহাকার। ১ জানুয়ারি ছিল এই বরেণ্য সংগীতব্যক্তিত্বের ৭০তম জন্মদিন। ২০১৮ সালে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও…’। আজ তাঁর সেই আকুতি প্রতিটি বাঙালির মনে বাজছে। গতকাল তাঁর জন্মদিনটি নিরবে-নিভৃতে পার হলেও ভক্ত ও অনুরাগীদের হৃদয়ে তিনি আগের মতোই অমলিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর গান ও স্মৃতি শেয়ার করে মানুষ জানিয়েছেন—‘আপনাকে ভুলিনি স্যার, ভোলা সম্ভবও নয়।’

কিশোর যোদ্ধা থেকে সংগীতের মহীরুহ

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জীবন ছিল বর্ণাঢ্য এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কৈশোরেই এক দুঃসাহসী অভিযানে পা বাড়িয়েছিলেন। মাত্র সাড়ে ১৪ বছর বয়সে তিনি হাতে রাইফেল তুলে নিয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধের সেই বীভৎস স্মৃতি আর বিজয়ের গৌরব তাঁর সংগীত জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাইফেল ছেড়ে তিনি হাতে তুলে নেন গিটার। টানা আট বছর তিনি কেবল দেশের গান তৈরি করেছেন, যা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মানুষের মনে দেশপ্রেমের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিল।

চলচ্চিত্রের সংগীতে এক নতুন যুগ

১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা শুরু করলেও তাঁর প্রকৃত জয়যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে ‘নয়নের আলো’ ছবির মাধ্যমে। বাংলা চলচ্চিত্রের সুরের ধারাকে তিনি একাই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরে উঠে এসেছেন বহু কিংবদন্তি শিল্পী। সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা থেকে শুরু করে জেমস বা আইয়ুব বাচ্চু—সবার কণ্ঠেই তিনি এমন সব সুর তুলে দিয়েছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম গেয়ে চলেছে। তাঁর সুরে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গানটি আজ আমাদের দ্বিতীয় জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কর্মজীবন ও প্রাপ্তি একনজরে:

ক্ষেত্রবিস্তারিত তথ্য
জন্ম১ জানুয়ারি ১৯৫৬, ঢাকা
মুক্তিযুদ্ধ২ নম্বর সেক্টরের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাদের একজন
উল্লেখযোগ্য গানসব কটা জানালা খুলে দাও না, সেই রেললাইনের ধারে, ও মাঝি নাও ছাইড়া দে
চলচ্চিত্র সংখ্যা৩০০-এর অধিক ছবিতে সংগীত পরিচালনা
পুরস্কার ও সম্মাননাএকুশে পদক (২০১০) ও একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
বিশেষ অবদাননতুন প্রজন্মকে সংগীতে উৎসাহিত করতে ‘ক্লোজআপ ওয়ান’ বিচারক
প্রয়াণ২২ জানুয়ারি ২০১৯

মানবিক গুণাবলি ও শেষ বেলা

ব্যক্তিজীবনে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা ও বোহেমিয়ান। নিজের জন্য বিত্ত-বৈভব না গড়ে তিনি সারা জীবন ব্যয় করেছেন নতুন নতুন সুর সৃষ্টিতে। তরুণ শিল্পীদের কাছে তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষের মতো। ‘ক্লোজআপ ওয়ান’ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে তিনি কেবল গানই শোনেননি, বরং প্রতিযোগীদের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। ২০১৮ সালের শেষ দিকে তাঁর হৃদযন্ত্রে জটিলতা ধরা পড়ে এবং অবশেষে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সেই আশঙ্কা—‘আমাকে যেন ভুলে না যাও’—সত্যি হয়নি। বাংলা গান যতদিন বেঁচে থাকবে, ‘বাংলার বুলবুল’ হয়ে তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তাঁর সৃষ্টি প্রতিটি জানালা খুলে দেয় দেশপ্রেমের, প্রতিটি সুর মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়কে।