কেনেডি সেন্টার বর্জনের মিছিলে অস্কারজয়ী সুরকার স্টিফেন শোয়ার্টজ

আমেরিকার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ‘জন এফ. কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস’-কে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিল্পীদের গণবর্জন এখন এক চরম সংকটে রূপ নিয়েছে। অস্কারজয়ী বিখ্যাত মিউজিক্যাল ‘উইকড’ (Wicked)-এর স্রষ্টা স্টিফেন শোয়ার্টজ এবার এই বর্জনের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছেন। তিনবার অস্কার ও তিনবার গ্র্যামি বিজয়ী এই কিংবদন্তি সুরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় মেরুকরণের কারণে কেনেডি সেন্টার এখন আর অবাধ শৈল্পিক প্রকাশের জায়গা নেই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে পা রাখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”

বর্জনের প্রেক্ষাপট ও শোয়ার্টজের অবস্থান

৭৭ বছর বয়সী স্টিফেন শোয়ার্টজ আগামী ১৬ মে ওয়াশিংটন ন্যাশনাল অপেরা গালা অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করার জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। শোয়ার্টজ জানান, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তিনি এই আমন্ত্রণে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু এরপর থেকে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটেছে। তাঁর মতে, কেনেডি সেন্টার তার চিরাচরিত অরাজনৈতিক ঐতিহ্য হারিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নাম পরিবর্তন বিতর্ক

কেনেডি সেন্টারের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। ঐতিহ্যগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি দ্বিপক্ষীয় (Bipartisan) বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হতো। তবে ট্রাম্প তাঁর অনুগত সমর্থকদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এমনকি ভবনের গায়ে নিজের নাম যুক্ত করার প্রচেষ্টাও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের যে আইনের মাধ্যমে কেনেডি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই অনুযায়ী আইনসভা বা কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া এর নামে কোনো পরিবর্তন আনা সরাসরি ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন।

শিল্পীদের গণপ্রস্থান ও আইনি লড়াই

স্টিফেন শোয়ার্টজ একা নন, গত এক বছরে বহু নামী শিল্পী কেনেডি সেন্টার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ইসা রে, রিয়ানন গিডেন্স এবং ‘হ্যামিলটন’ মিউজিক্যাল টিম তাদের শো বাতিল করেছে। এছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন শন্ডা রাইমস ও রেনি ফ্লেমিং-এর মতো ব্যক্তিত্বরা। সম্প্রতি জ্যাজ ড্রামার চাক রেড বড়দিনের শো বাতিল করায় কেনেডি সেন্টারের বর্তমান প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে ১০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা করার হুমকি দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই শিল্পীরা ‘বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে আচরণ করছেন।

কেনেডি সেন্টারের বর্তমান পরিস্থিতির সারাংশ:

বিষয়ের বিবরণবিস্তারিত তথ্য
বর্জনকারী প্রধান শিল্পীস্টিফেন শোয়ার্টজ, ইসা রে, বেন ফোল্ডস, রেমি ফ্লেমিং
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুট্রাম্পের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ ও বোর্ড পুনর্গঠন
আইনি জটিলতাভবনে ট্রাম্পের নাম যোগ করা ও নাম পরিবর্তনের বৈধতা
রেটিং বিপর্যয়দর্শক সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ হ্রাস (৪.১ মিলিয়ন)
সর্বশেষ বাতিল হওয়া শোজ্যাজ ড্রামার চাক রেড ও ডগ ভ্যারোন ড্যান্স ট্রুপ
কর্তৃপক্ষের অবস্থানশো বাতিলকারী শিল্পীদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি

দর্শক খরা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

কেবল শিল্পীরাই নন, সাধারণ দর্শকদের মধ্যেও কেনেডি সেন্টারের অনুষ্ঠানের প্রতি অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্পের সঞ্চালনায় প্রচারিত ‘কেনেডি সেন্টার অনার্স’ অনুষ্ঠানটির রেটিং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিলসেনের তথ্য অনুযায়ী, দর্শক সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কমে গেছে। যদিও হোয়াইট হাউস একে সাফল্য হিসেবে দাবি করছে, তবে বাস্তবের প্রেক্ষাপট বলছে ভিন্ন কথা। শিল্পীদের এই ধারাবাহিক বয়কট আমেরিকার এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিকে একটি অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।