বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজপথের মিত্রদের মধ্যে নতুন এক কৌশলগত মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা বিএনপির সঙ্গ ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় এসেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে ভোটের মাঠে জামায়াত-এনসিপি-এলডিপিসহ মোট ১০টি দলের এক নতুন জোটগত অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে।
কর্নেল অলি আহমদের এই সিদ্ধান্তের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর দল এলডিপিতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ এলডিপি ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। সূত্রমতে, তিনি কুমিল্লা-৭ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতার এমন প্রস্থানে এলডিপি সাংগঠনিকভাবে ধাক্কা খেলেও অলি আহমদ জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। তবে অলি আহমদ নিজে কোন আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের ঘটনাবহুল ইতিহাস নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
কর্নেল (অব.) অলি আহমদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রোফাইল
| বিষয় | বিবরণ |
| মুক্তিযুদ্ধে অবদান | সাবসেক্টর কমান্ডার এবং ‘বীর বিক্রম’ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। |
| রাজনীতিতে প্রবেশ | ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বিএনপিতে যোগদান। |
| সরকার পরিচালনা | ১৯৯১–৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী যোগাযোগমন্ত্রী। |
| এলডিপি গঠন | ২০০৬ সালে অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে বিএনপি ছেড়ে নিজস্ব দল প্রতিষ্ঠা। |
| সর্বশেষ অবস্থান | ২০২৫-এর নির্বাচনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ব্লকের শরিক। |
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)—এই ছয়টি দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এতে যুক্ত হলে জোটের পরিধি দাঁড়ায় আটে। রবিবারের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নতুন করে এনসিপি এবং কর্নেল অলির এলডিপি যুক্ত হওয়ায় এখন মোট ১০টি দল একযোগে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছে।
সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল অলি আহমদ উপস্থিত থাকলেও তিনি কোনো কথা বলেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের আমিরের পাশে অলির এই অবস্থান কেবল নির্বাচনী সমঝোতা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সিপাহসালার এবং বিএনপি গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা এখন জীবনের শেষলগ্নে এসে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে ভোটের লড়াইয়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ১০ দলের এই সমঝোতা ভোটের মাঠে বড় দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
