লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্প: স্বচ্ছতার নতুন নজির গড়তে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা

চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক চুক্তিটি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি চুক্তিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কিন্তু এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে সম্পাদিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি যেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সেই পুরনো রীতিনীতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। চুক্তির শর্তাবলি গোপন রাখা এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্ধকারে রেখে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সরকারের স্বচ্ছতার অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

২০২৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ভিত্তি ছিল মায়েরস্ক গ্রুপের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে অনেক বিতর্কিত চুক্তি বাতিল করলেও লালদিয়া প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সুইস চ্যালেঞ্জ’ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি না করে এভাবে একপক্ষীয়ভাবে এগোানোকে বিশেষজ্ঞরা উত্তম চর্চা হিসেবে দেখছেন না। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে গতিতে এই চুক্তির দাপ্তরিক কাজ শেষ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রস্তাব দাখিল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত স্বাক্ষর পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তির দ্রুততম পরিক্রমা

দাপ্তরিক ধাপতারিখ ও সময়কালবিশেষ পর্যবেক্ষণ
প্রস্তাব পেশ৪ নভেম্বর, ২০২৫এপিএম টার্মিনালস প্রস্তাব জমা দেয়।
মূল্যায়ন ও বৈঠক৫ – ৮ নভেম্বরসাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আলোচনা চলেছে।
মন্ত্রণালয় ও বোর্ড অনুমোদন৯ – ১০ নভেম্বরসিপিএ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত সায়।
মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত১২ নভেম্বরঅর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন।
প্রধান উপদেষ্টার সই১৬ নভেম্বরচূড়ান্ত প্রশাসনিক সম্মতি ও এলওএ প্রদান।
চুক্তি সম্পাদন১৭ নভেম্বরএলওএ দেওয়ার পরদিনই চূড়ান্ত স্বাক্ষর।

দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পের সফলতার জন্য জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য। কারণ চুক্তির মূল কর্মকাল শুরু হবে আগামীতে নির্বাচিত সরকারের আমলে। অথচ দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে এই প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাদের পক্ষ থেকে আসা বিবৃতিগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অংশীজনদের পাশ কাটিয়ে গেছে। যেখানে ভারত, ব্রাজিল বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো পিপিপি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ জনসমক্ষে প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার পিপিপি আইন-২০১৫ এর গোপনীয়তা ধারার দোহাই দিয়ে তথ্য অধিকার আইনকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করছে।

বাস্তবতা হলো, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তা জনদলিলে পরিণত হয় এবং তা প্রকাশে কোনো আইনি বাধা থাকার কথা নয়। অন্তর্বর্তী সরকার যদি পূর্ববর্তী শাসনের মতো গোপনীয়তার সংস্কৃতি ধরে রাখে, তবে তা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক ও অগণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। লালদিয়া চুক্তিটি হয়তো দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে, কিন্তু একে ঘিরে যে রহস্যময় তড়িঘড়ি ও ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তা প্রশাসনের স্বচ্ছতার দাবিকে দুর্বল করে দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে হলে অবিলম্বে এই চুক্তির সারসংক্ষেপ জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা উচিত।